চিন্তাগুলো… -১

আজকাল ঘানি টানা গরুর মত লাগে নিজেকে।

সারাদিন অফিস করি, সকালে ৭ টায় বাসা থেকে বের হই, ফিরি রাত ৮-৯ টার দিকে। বাসায় এসে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ি; বাবা-মা এর সাথে ঠিকমত কথাও বলতে পারিনা। মুখে কিছু গুজে দিয়ে আবারো ঘুম , আবার নতুন দিনের শুরু, এবং আবারো সাইকেলের পুনরাবৃত্তি।

১২ তলায় কিউবিকল। পাশে রবির কর্পোরেট টাওয়ার। মনিটরের দিকে ক্লান্ত হয়ে গেলে জানালা দিয়ে তাকায়ে আকাশ দেখি। বিষন্ন, বিষাক্ত ঢাকা শহরের আকাশ। ছোট্ট হয়ে আশে বিশাল বিল্ডিংগুলো।

মাঝে মাঝে অফিস থেকে সন্ধ্যার পরে বেরোই। জানালার পাশে কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে ঢাকা শহরের ঝলমলে আলো দেখি। আর দূরে গুলশান লেকের পাশে বসতির টিমটিমে আলো দেখি। ঢাকা শহরের বৈপরীত্য… কর্পোরেট জীবনের পাশে দারিদ্র্যের সংগ্রাম।

ক্লান্ত শরীর নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে আবারো লাইনে দাড়ায়ে বাসের অপেক্ষা। ধুলা-কাদা মাখা একটা শহরে জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষগুলোর সাথে। আশেপাশের বন্ধুগুলোর কথা যখন শুনি তখন ভালোই লাগে, সব GRE পড়ে বাইরে যাওয়ার চিন্তায় আছে, পেপার অথবা রিসার্চ করা নিয়ে ব্যস্ত।

মাঝে মাঝে নিজেকে অনেক একা লাগে। আমি জানিনা আমার থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কি ভূল কিনা। বাইরে যেতে ইচ্ছা যে করেনা তা না। কিন্তু ইচ্ছা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য অনেক। মাঝে মাঝে রাত্রে চুপচাপ বারান্দায় বসে হাতে জ্বলন্ত শলাকা নিয়ে ভবিষ্যত নিয়ে প্রচুর চিন্তা হয়।

আমি নিজেকে দেশপ্রেমিক মনে করিনা। কিন্তু কোনো বিচিত্র কারনে অনেক মায়া জন্মায়ে গেসে। অনেক পিছুটান আছে। বাবা-মায়ের চেহারায় দিন দিন বয়সের ছাপ পড়ছে। তাদের দিকে তাকায়ে নিজেকে হঠাৎ হঠাৎ অসহায় বলে মনে হয়। খুব মাথা খারাপ হয়ে গেলে তখন জামি, মাহমুদ, সাব্বির অথবা সাকিব কে ফোন দিয়ে তুখোড় গালিগালাজ, অথবা মুক্তমঞ্চে চা আর টা এর আড্ডা দেই। কিছুক্ষনের জন্য হলেও বিষন্নতা পালিয়ে যায়। অথবা ফেসবুকে বিচিত্র স্ট্যাটাসের পরেই অনন্যার কল অথবা ঝাড়ি; এরকম বন্ধু সৌভাগ্য কম হয়। পাশে ছোটখালার বাসা, পিচ্চিগুলোকে বড়ো হতে দেখি, হঠাৎ হঠাৎ উদয় হই বিরক্ত করতে, খালাকে বলি, “খালা, চা খেতে ইচ্ছা করতেসে। 😛 কি কি খাওয়াবেন? ” অথবা কাজিন দের কে বিরক্ত করা, অথবা হঠাৎ একদিন এর জন্য ঢাকা থেকে পালায়ে যাওয়া, আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা… কেনো জানি এগুলো ছেড়ে পালাতে ইচ্ছা করেনা।

আমি নিজেকে হয়তবা খুব বেশি কর্তব্যপরায়ন মনে করিনা। কিন্তু কিছু কর্তব্য অসমাপ্ত রেখে চলে যাওয়াটা কেনো জানি পছন্দ হয়না। ধুলোমাখা এ শহরে, হয়ত বা অনেক possibility এর সাথে trade-off করে অনেক কস্ট করে থাকতে হবে… কিন্তু থাকতে হবে। জীবনে সব দিন সমান যায়না। সব দিন সুখের হয়না। কিন্তু মানুষ কে কোনো আশা নিয়ে বেচে থাকতে হয়। এইটাই জীবন।

জীবনে প্রচুর ভূল করেছি। প্রচুর তিক্ত অভিজ্ঞতা পেয়েছি। অনেক বার ঘা খেয়েছি, উঠে আবার দাড়াতে কি পরিমান কস্ট হয়েছে তা আমি বাদ দিয়ে উপরে নিয়তির সূতা নিয়ে যিনি খেলতে পছন্দ করে তিনি জানেন। কিন্তু উঠে ঠিক ই দাড়িয়েছি। আমি আমার অতীত কে পরিবর্তন করতে পারবোনা। কিন্তু ভবিষ্যতের খাতায় এখনো আচড় কাটেনি, আমি ভবিষ্যতে অতীতের ভূলগুলো আর করতে চাইনা। জীবন একটাই। কখনো মাথা নত করিনি, করব ও না। একরোখা হয়ে হতাশা গুলোর সাথে যুদ্ধ করেই অনাগত ভবিষ্যত কে গড়ে কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখে যাবো।

About শিমন

একটি উত্তর দিন