শেয়ার বাজার বিশ্লেষণ [su]-[/su] সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া আস্থা ফিরবে না

দেশের শেয়ারবাজার যে পর্যায়ে গিয়েছিল, তাতে পতন অনিবার্য ছিল। প্রশ্ন ছিল, পতন কখন হবে এবং কী গতিতে হবে। শেষ পর্যন্ত পতন ঘটল। তবে ধারণার আগে এবং অনেক দ্রুতগতিতেই সেটি হয়েছে। যত দ্রুতগতিতে বাজার বেড়েছিল, তার তুলনায় অনেক কম সময়ে বাজারের পতন ঘটল।
বাজার এখন ক্রেতাশূন্য বলা যায়। রাতারাতি লাখপতি হওয়ার জন্য যাঁরা বাজারে ছুটে এসেছিলেন, তাঁরা এখন যেকোনোভাবে বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে মরিয়া হয়ে পড়েছেন। আর এ কারণেই কিছুতেই পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। সবাই এখন শেয়ার বিক্রি করার দীর্ঘ সারিতে।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি খাতের একটি অংশের প্রবণতা ছিল, একের পর এক কোম্পানি খুলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া। এই ঋণের বড় অংশই আর পরিশোধ করা হয়নি। সময় পাল্টেছে। এখন আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার সুযোগ কম, তবে প্রবণতা বন্ধ হয়নি। এখন টাকা তোলার জায়গা হিসেবে তৈরি হয়েছে শেয়ারবাজার। আর এ জন্য রীতিমতো আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে। তাঁদের বড় অংশ বাজার ভালো বোঝেন না, ভালো শেয়ার চেনেন না, গুজব ছাড়া অন্য কিছু কানে তোলেন না, কখন শেয়ার কিনতে ও বিক্রি করতে হয়, জানেন না। আর এ কারণে বাজার থেকে টাকা তুলতে এঁদেরই প্রয়োজন বেশি। এসব বিনিয়োগকারী উচ্চমূল্যে শেয়ার কিনে ফেলেন বলেই কারসাজি করা সহজ। কারণ, তাঁরা না থাকলে তো শেয়ারের দাম বাড়ানো যাবে না।
দুই বছর আগেও যেসব উদ্যোক্তা নিজ প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতন দিতে পারতেন না, ঋণখেলাপি হিসেবে সমাজে কুখ্যাতি কুড়িয়েছিলেন, তাঁরাই রাতারাতি হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে একের পর এক প্রতিষ্ঠান কিনেছেন। শেয়ারবাজার অনেকের কাছেই আলাদিনের প্রদীপ হয়ে দেখা দিয়েছে। বেসরকারি খাতকে আকৃষ্ট করতে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে। এই পদ্ধতির অপব্যবহার করে কয়েক শ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। অথচ বেশি দামে শেয়ার বিক্রির পরপরই এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম পড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
চিটাগাং ভেজিটেবল অনেক দিন বন্ধ ছিল, অথচ গুজব ছড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার টাকার শেয়ার এক মাসে করা হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকা। এ রকম অনেক ‘জেড’ গ্রুপের শেয়ারের দর অযথাই বেড়েছে। অর্থাৎ সবকিছুই হয়েছে বাজারে, কিন্তু দেখার যেন কেউ ছিল না। যাঁরা দেখবেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এসব কারসাজির অংশ হয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই খাদ্য নিয়ে অতি সতর্ক থাকে। কিন্তু ’৯৬-এর শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনা থাকা সত্ত্বেও এবার দলটি সরকার গঠন করে শেয়ারবাজার নিয়ে সে রকম সতর্ক ছিল না। ’৯৬-এর ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের একটি বড় অংশ এবারও শেয়ারবাজারে সক্রিয় ছিল। তারা নানাভাবে বাজারকে প্রভাবিত করেছে। তদারকিও ছিল ঢিলেঢালা। যে যার ইচ্ছামতো আচরণ করেছে। আর তার ফল বাজারের পতন।
বাজার এত দিন ধরে মোটেই বাজারের শক্তিতে চলেনি। তদারকির অভাব, একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত, কারসাজি, নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং কিছু মানুষের লোভের ফল আজকের বাজার। বাজার তদারকির মূল কাজ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি)। গত দুই বছরে অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি এবং বারবার সিদ্ধান্ত বদল করেছে। এ সময় এসইসিকে পরামর্শ দেওয়ার মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না। যে যার মতো পরামর্শ দিয়ে গেছে এসইসিকে। এদের মধ্যে স্বার্থান্বেষী মহলই ছিল বেশি। ফলে বারবার সিদ্ধান্ত বদল হয়েছে। সিদ্ধান্ত বারবার পরিবর্তন করিয়ে বাজারকে ওঠানো হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণেও বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এসইসি। শেয়ারের মূল্যসূচক কত থাকাটা অর্থনীতির মৌলশক্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, তা কখনোই মূল্যায়ন করা হয়নি। সেটি কি পাঁচ হাজার, ছয় হাজার নাকি সাড়ে ছয় হাজার। অথচ বাজারকে অব্যাহতভাবে বাড়তে দেওয়া হয়েছে। এসইসি ঋণসীমা বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিয়েছে। বেশি প্রিমিয়ামে শেয়ার ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে বাজার হয়ে যায় অতিমূল্যায়িত।
বাজার যে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, এটি কিন্তু বিভিন্ন মহল থেকেও বারবার বলা হয়েছিল। গত বছরের ৯ আগস্ট দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফের একটি অনুষ্ঠানে যৌথভাবে বাজারকে অতিমূল্যায়িত উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘বাজারে কোনো বিপর্যয়ের দায় সরকারের ওপরেই বর্তাবে।’ তার পরও বাজারকে সামলে রাখার কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং একই সংগঠনের আরেকটি অনুষ্ঠানে ২৪ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘পুঁজিবাজারে তেজি ভাব থাকলেও অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়েছে বলে আমি মানতে নারাজ।’ বাজার ’৯৬-এর মতো হবে না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন।
বাজারের আজকের পরিস্থিতির জন্য সার্বিকভাবে দায় সরকারেরই। সরকারের হাতে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ছেড়ে দেওয়ার একাধিক তারিখ নির্ধারণ করেও ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এই ব্যর্থতার জন্য কারও শাস্তি হয়েছে, এমনটি জানা যায়নি। বাজারে বিনিয়োগকারীদের ডেকে এনে চাহিদা বাড়ানো হলো অথচ বাড়ল না ভালো শেয়ারের পরিমাণ। ফলে ভালো শেয়ারের পাশাপাশি খারাপ শেয়ারের দামও বাড়ানোর কাজটিও কারসাজিকারীদের পক্ষে সহজ হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বড় দায় কিন্তু এসইসির। তাদেরই মূল কাজ ছিল বাজারকে সুচারুভাবে পরিচালিত করার। তারা তা করতে পারেনি। আবার দায়ের ভাগ বাংলাদেশ ব্যাংককেও নিতে হচ্ছে। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূল কাজ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা নয়। অথচ মনে হচ্ছিল, এটাই তাদের মূল কাজ। তারা শিল্প বিনিয়োগে ঋণ না দিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগেই বেশি উৎসাহ দেখায়। এ কারণে বিনিয়োগ মন্দার সময়েও চাঙা শেয়ারবাজারের সুযোগ নিয়ে ব্যাংকগুলো ২০১০ সালে অতিরিক্ত পরিচালন মুনাফা করেছে। আর এর বড় অংশই এসেছে শেয়ারবাজার থেকে। আবার অনেক উদ্যোক্তাও শিল্প প্রতিষ্ঠার নামে ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে খাটিয়েছেন। বাজারের পতনের মধ্যেও এর কোনো আঁচ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গায়ে লাগেনি। ডিসেম্বরের ব্যাংক সমাপনীর সুযোগ নিয়ে সবাই বের হয়ে গেছে।
নতুন বছরের শুরুতে বাজার যখন হোঁচট খাওয়া শুরু করে, তখনো বাজারকে নিজ গতিতে চলতে না দিয়ে কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়। এই সুযোগে কারসাজির সঙ্গে জড়িতরাসহ অনেক বড় বড় বিনিয়োগকারী বাজার থেকে বের হয়ে গেছেনও বলেও মনে করা হচ্ছে। কেবল আটকা পড়েছেন শেষ সময়ে আসা অসংখ্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী।
এক বছর ধরে বাজারে দুটি সংকেত দেওয়া হয়েছে। যেমন—বাজারে কারসাজি করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। ’৯৬-এর ঘটনায় কেউ শাস্তি না পাওয়ায় এই সংকেতটি সব সময়ই জোরালো ছিল। আরেকটি সংকেত হচ্ছে, সূচক পড়লেও যেকোনো উপায়ে তা আবার বাড়ানো হবে। ফলে একধরনের আশ্বস্ততা থেকেই বিনিয়োগ করে গেছেন অনেকে। কিন্তু একবার আতঙ্ক ছড়ালে সেখান থেকে বের হওয়া সহজ নয় বলেই এখন আর পতন ঠেকানো যাচ্ছে না।
ডিএসইর পক্ষ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার বাজারে জালিয়াতি আছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই অভিযোগের সত্যতা খুঁজে বের করা এখন সরকারের কাজ। আর এই কাজটি করতে না পারলে বাজারে আস্থা ফিরে আসবে না। এখনো বাজারে বিনিয়োগযোগ্য অনেক শেয়ার রয়েছে। অনেক ভালো ভালো কোম্পানি আছে। ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী আছেন। এখন প্রয়োজন সঠিক কাজটি করা। অর্থ মন্ত্রণালয়, এসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংককে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

তথ্যসুত্র: [link|http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-01-21/news/125268|১ম আলো]

About নয়ন

৩ comments

  1. আমার ও একইরকম মনে হয়েছে। একুশে টেলিভিশন আগের সেই মানটি বজায় রাখতে পারেনি।

  2. আমার ও একইরকম মনে হয়েছে। একুশে টেলিভিশন আগের সেই মানটি বজায় রাখতে পারেনি।

একটি উত্তর দিন