আইন অনুযায়ী আমার দেশ বন্ধ হয়েছে ?

আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল ও মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতার প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘এ ঘটনায় সরকারের কোনো হাত নেই। ঢাকার জেলা প্রশাসক পত্রিকাটির প্রকাশক হাসমত আলীর লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছেন, ‘আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল হয়েছে এর মালিকানা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে। সরকার আইন অনুযায়ী এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিয়েছে।

এবার দেখা যাক আইন কী বলে?

বাংলাদেশ প্রিন্টিং প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স এ্যাক্ট-১৯৭৩ এর ১১ ধারায় বলা হয়েছে ,‘মুদ্রাকর বা প্রকাশক ৬ মাসের অধিককাল বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করলে, বাংলাদেশ ত্যাগের পূর্বেই তার অনুপস্থিতকালীন দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির নাম এবং ঐ ব্যক্তির সম্মতিসূচক বিবরণী লিখিতভাবে জেলা প্রশাসক বরাবর দাখিল করতে হবে। অন্যথায় সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল বলে গণ্য হবে। ২০(ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোন সংবাদপত্র অশালীন বা অশ্লীল বক্তব্য প্রকাশ করলে সরকার সেই সংবাদপত্র বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।’

আইনজ্ঞরা বলছেন, ন্যয়বিচারের দাবী হচ্ছে, কোন পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করতে হলে এজন্য সংশ্লিষ্ট পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথ অভিযোগ উত্থাপন করতে হবে এবং সত্মোষজনক জবাব দানের সুযোগ দিতে হবে। যদি যথাযথ তদন্তের পর দেখা যায় যে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশনায় ব্যর্থ হচ্ছে সে ক্ষেত্রে ডিক্লারেশন বাতিলের জন্য নোটিশ দিয়ে যৌক্তিক সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু আমার দেশের ডিক্লারেশন বাতিলের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম মানা হয়েছে কি? মানা হয়নি। নিয়ম না মেনে এক রাতের মধ্যে একটি পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করে দেয়ার ঘটনা স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ ছাড়া আর কিছু হতে পারে ? তড়িঘড়ি করে আমার দেশ বন্ধ করে দেয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকাশক হাসমত আলী যদি সত্যি সত্যি স্বেচ্ছায় কোন প্রতারণা মামলা করে থাকেন তবে এর সঙ্গে রাতারাতি পত্রিকার ডিক্লারেশন বন্ধ করে দেবার এবং প্রেস সীলগালা করে দেবার সম্পর্ক কি? মামলা হলে তা আইনের ভিত্তিতে আদালতে মোকাবেলা হবে। মাহমুদুর রহমান দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর সাজা হবে। কিন্তু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার এবং তার শত শত কর্মীকে পথে বসানোর এ কোন্ বিস্ময়কর প্রবণতা!

অভিযোগ উঠেছে, প্রকাশক হিসেবে হাসমত আলীর নাম ব্যবহার করার কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকাশক হিসেবে হাসমত আলীর নাম ব্যবহার করার জন্য দায়ী কি মাহমুদুর রহমান? আমার দেশ কর্তৃপক্ষ তো প্রকাশকের নাম পরিবর্তনের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে আবেদন করে রেখেছেন। সেই আবেদনকে ঝুলিয়ে রাখা হলো কেন? নাকি মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের প্রেক্ষাপট তৈরি করার জন্যই এমনটি করা হয়েছে?

আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার ও প্রকাশনা বাতিলের প্রতিবাদে আইনজীবী সমাবেশে জ্যেষ্ঠ আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, ইত্তেফাকের মানিক মিয়ার সাথে মোনায়েম খার সরকার যে আচরণ করেছিল বর্তমান সরকার মাহমুদুর রহমানের সাথে একই আচরণ করেছে। আমার মতে, হাসিনা সরকার আমার দেশের সাথে তাই করছে যা মুজিব সরকার করেছিল দৈনিক গণকণ্ঠ ও দেশ বাংলা বন্ধের ক্ষেত্রে।

‘তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দৈনিক গণকণ্ঠ ও দৈনিক দেশবাংলা বন্ধের ঘটনা ছিল অনেকটা প্রতারণামূলক। তারা গণকণ্ঠ পত্রিকা সরাসরি বন্ধ না করে গণকণ্ঠের মুদ্রণালয় প্রতিষ্ঠান, পরিত্যক্ত সম্পত্তি জনতা প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজেস লিঃ-এর প্রশাসক পরিবর্তনের নামে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন যাতে পত্রিকা প্রকাশনার স্বাভাবিক তৎপরতা অব্যাহত রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আকস্মিকভাবে ২৩ মার্চ (১৯৭৩) সরকার জনতা প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজেস লিঃ-এর প্রশাসক জনাব মনিরুল ইসলামকে অপসারণ করে ঢাকা মহানগর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপ-প্রধান জনাব নাজির হোসেন হায়দার পাহাড়ীকে প্রশাসক নিয়োগ করেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গেই গণকণ্ঠের প্রধান ফটকে পুলিশ বসিয়ে দেয়া হয়। ২৮ মার্চ অজ্ঞাত ব্যবসায়িক চুক্তির অজুহাত দেখিয়ে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। পুলিশ সাংবাদিক কর্মচারীদের বলপূর্বক অফিস থেকে বের করে দেয়।’

এবার হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, ছাত্রলীগের অপকর্মসহ সরকারের সমালোচনা করায় চ্যানেল ওয়ান ও আমার দেশ যেভাবে বন্ধ করা হলো মুজিব শাসনামলে তাই করা হয়েছে সরকার বিরোধী পত্রিকাগুলোর ক্ষেত্রে। স্বাধীনতার প্রথম বছরেই তারা ‘গণশক্তি’, ‘হক কথা’, ‘লাল পতাকা’, ‘মুখপত্র’, ‘বাংলার মুখ’, ‘স্পোকসম্যান’ প্রভৃতি সাপ্তাহিক পত্রিকা বন্ধ করে দেয়। পত্রিকাগুলো নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং সম্পাদকরা কারান্তরালে নিক্ষিপ্ত হন। ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ ১০টি সংবাদপত্রের প্রকাশনা স্থগিত ও একটি পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করে। ১৯৭৩ সালে এর সাথে যুক্ত হয় যথাক্রমে আরো ১০২টি ও ৬টি পত্র-পত্রিকা। ১৯৭৩ সালের মার্চ ও আগস্ট মাসে যথাক্রমে ঢাকার দৈনিক গণকণ্ঠ ও চট্টগ্রামের দৈনিক দেশবাংলার প্রকাশনা বাতিল করা হয় এবং পত্রিকা দুটির সম্পাদক ও তাদের সহযোগীদের জেলখানায় নিক্ষেপ করা হয়।

মুজিব কন্যা হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রা বন্ধ করে দিয়ে কয়েকশ’ সাংবাদিককে বেকারত্বের মুখে ঠেলে দেয়া হয়। এবারও তাই করছে। আর এ জন্যই অনেকেই বলছেন, সরকার গণমাধ্যমের সাথে ফ্যাসিবাদী আচরণ করে বাকশালের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের মন্ত্রীরা যত ব্যাখ্যাই দিক না কেন জনগণ তা বিশ্বাস করবে না।

About আশরাফ রহমান

একটি উত্তর দিন