বাংলাদেশে বাম রাজনীতির সঙ্কট

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মূলত দুটি স্রোত বহমান। একটি হল স্বাধীনতার পক্ষশক্তি তথা সেক্যুলার ধারা। অন্যটি সামরিক শাসনের বেনিফিশিয়ারি অপরাজনীতির ধারা। স্বাধীনতার পক্ষের সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দল বলতে মূলত আওয়ামী লীগকেই বুঝায়। অন্যদিকে অপরাজনৈতিক ধারা প্রতিনিধি হল বিএনপি জামায়াত সহ অন্যান্য কিছু দল। কিন্তু এর বাইরে তৃতীয় পক্ষ বা বাম জোট বলতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে রাজনৈতিক আন্দোলন বিদ্যমান আমাদের দেশে তা নেই। যার কারণে গণতন্ত্র হারিয়েছে তার স্থায়িত্ব, সামরিক জুজুর ভয়ে জনগণের অধিকার বারবার হয়েছে পদদলিত এবং দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা হয়েছে ব্যহত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়েছিল, সেখানে বৃহৎ কোন বিরোধী দলের অস্তিত্ব না থাকলেও বাম চেতনাদর্শে বিশ্বাসী জাসদের ভূমিকা ছিল সক্রিয়্ সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা এবং জাতীয় স্বার্থরক্ষায় আপোসহীন ভূমিকা রাখাই বাম দলগুলোর প্রধান দায়িত্ব। যদিও পরবর্তীতে জাসদের গণবাহিনী গঠন ও সশস্ত্র বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ঘটনা জাতির ইতিহাসে এক ট্রাজেডিময় অধ্যায়ের জন্ম দেয়। এর পরেই জাতির ললাটে অঙ্কিত হয় ১৫ বছরের সামরিক বুটের ছাপ। মূলত স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে বাম রাজনীতির অগ্রজ যেসব ছাত্রনেতারা ছিলেন (মতিয়া, মেনন) তাদের অনেকেই পরবর্তীতে আওয়ামী লীদের সাথে যুক্ত হয়ে যান। ফলে কমিউনিস্ট আন্দোলন বঞ্চিত হয় সম্ভাবনাময় এসব তরুণ নেতৃত্ব থেকে। মূলত বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্তি, অভ্যন্তরীন কোন্দল, সমন্বয়ের অভাব, শক্তিশালী জোট গঠনে ব্যর্থতা, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টিতে অবহেলা, দেশ পরিচালনোয় গণতান্ত্রিক শক্তির অনুপস্থিতি ইত্যাদি কারণে বাম রাজনীতি হারাতে থাকে তার আগের জৌলস। বঙ্গবন্ধুর সময় বাদ দিলে স্বাদীনতার পর দেশে সেক্যুলার শক্তি ক্ষমতায় তেকেছে মাত্র ৬/৭ বছর। বাকি ৩০ বছরই ক্ষমতায় ছিল সামরিক শাসক ও অপরাজনীতির কুশীলবরা। কাজেই প্রতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের চর্চা আজ এই ২১ শতকেও আমাদের দেশে দেখা যায়না। বাম ধারার এককালের সারা জাগানো বেশ কিছু দলই আজ সাইনবোর্ড সর্বস্ব হয়ে পড়েছে। ওয়ার্কাস পার্টি, জাসদ ইত্যাদি দল হয়ে পড়েছে বহুধা বিভক্ত। বাম ধারার দলসমূহের মধ্যে ন্যাপ, সিপিবির অবস্থান কিছুটা ভাল হলেও এগুলো এখন পরিণত হয়েছে বুড়োদের দলে। কমরেড মোজাফফর আহমেদের মত বাম জ্যোতিষ্কও এরশাদ সরকারের সময় মন্ত্রিত্ব পেয়ে আদর্শ বিসর্জন দিয়ে আসেন। বাম দলগুলোর একটা বড় অংশই এখন আওয়ামী লীগের সাথে মহাজোট সরকারে যুক্ত। যে স্বপ্ন নিয়ে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল তার মূল লক্ষ্য ছিল অসাম্প্রদায়িক এবং শোষণ মুক্ত এক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, গণতন্ত্র আর সেক্যুলারিজমই হবে যার ভিত্তি। কিন্তু নানা কারণে সমন্বয় ও আন্তযোগাযোগের অবাবে তা আজও সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গঠনমূলক সমালোচনা, যেটা করতে বাম শক্তির বিকল্প নেই। তাই জাতির এ গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তে তাই সকল বাম দলের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে একটা বৃহত্তর বাম মোর্চা গড়ে তোলার দায়িত্বই আজ কমিউনিস্ট বোদ্ধাদের।
ভাল থাকুন ব্লগার। পরবর্তী পোস্টগুলিতে আমি অপরাজনীতি ও উর্দিপরা গণতন্ত্র বিষয়ে লিখব ইনশাআল্লাহ

About

একটি উত্তর দিন