<strong>এসো হে বৈশাখ এসো, এসো ……………</strong>

এসো হে বৈশাখ এসো, এসো ……………

‘তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে উড়ায়ে’ দিতে প্রভাতের অলোকচ্ছটায় আবহমান এ বাংলার দিক-দিগন্ত উদ্ভাসিত করে আগামীকাল ভোরের নতুন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে আসবে বাংলা বছরে নতুন দিন। আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতিকে অগ্নিস্নানে শূচি করে তুলতে আবার এসেছে বৈশাখ। শুভ নববর্ষ ১৪১৭। ‘দূরের পলাতক বলাকার ঝাঁকে’ হারিয়ে গেল ১৪১৬। ‘আজি এ ঊষার পুণ্য লগনে’ বাঙালীর কায়মনো প্রার্থনা : যা কিছু ক্লেদ, গ্লানি পাপ, মূঢ়তা, যা কিছু জীর্ণ-শীর্ণ-দীর্ণ, যা কিছু পুরাতন তা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে হোক ছাই। বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক। বর্ষবরণের উৎসবের আমেজে মুখরিত আজ বাংলার চারদিক। নতুনের আবাহনে কবিগুরুর সেই চিরায়ত সুর বাঙালীর প্রাণে প্রাণে অনুরণন তুলবে : এসো হে বৈশাখ এসো এসো হে . . .। গ্রীষ্মের অগ্নিজিহ্বা বাংলার বাতাসে ভূ-প্রকৃতিতে লকলক করে নেচে উঠবে। বসনেৱর সুধাভরা মদির রূপমাধুরীকে বিবর্ণ করে দিয়ে গ্রীষ্ম তার উদগ্র থাবা মেলে ধরবে আবার প্রকৃতিতে। প্রকৃতিতে জাগবে প্রলয় নাচন। বাতাস পাবে উদ্দামতা, আকাশে ঝলকাবে বিদ্যুৎবহ্নি, ঈশান-দুয়ার খুলে পশ্চিমা ঝড় দৈত্য সৈন্যের মত ধেয়ে আসবে বাংলার জনপদে-বসতিতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়: বৈশাখে বিদ্যুৎ-চঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে ছিনিয়ে নিতে আসা কালো শ্যেনপাখীর মতো প্রলয়ংকরী ঝড় ধেয়ে আসবে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে নগরে-বন্দরে। গ্রীষ্মের অগ্নিবাণে প্রাণী, বৃক্ষ লতা গুল্ম, মৃত্তিকায় জাগে তৃষ্ণা। সেই আকুল নিদাঘ তিয়াষা ঘুচাতে বজ্রের রথে চেপে আসে প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী। ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশির গুরম্নগম্ভীর গর্জনে আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়ে জলপ্রপাতের ছন্দোময় বর্ষণ ধারায়। বাংলার প্রকৃতি আবার হয়ে উঠবে উর্বর সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা।

“তোরা সব জয়ধ্বনি কর /তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখীর ঝড়”. . . কবি কাজী নজরম্নল ইসলামের এই সুর ধ্বনির ভেতর দিয়েই বাঙালী নতুন বছরে সব অপ্রাপ্তি ভুলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে ।

আগামীকাল সরকারি ছুটির দিন। পত্র-পত্রিকা প্রকাশ করেবে বিশেষ সংখ্যা। রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সেই সঙ্গে আছে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নানা আয়োজন, ব্যবসায়ীদের হালখাতা।

কৃষির সঙ্গে বাংলা নববর্ষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই সন প্রবর্তনের সূচনা থেকেই। চিরকাল ঋতুর উপর ভিত্তি করেই হয় ফসলের চাষাবাদ। মোগল সম্রাট আকবর প্রচলন করেন বাংলা সনের। এর আগে মোগল বাদশাহগণ রাজকাজে ও নথিপত্রে ব্যবহার করতেন হিজরী সন। হিজরী চন্দ্র বছর, যা ন্যূনধিক ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয়। কিন্তু সৌর বছর পূর্ণ হয় ন্যূনধিক ৩৬৫ দিনে। বছরে প্রায় ১১ দিনের পার্থক্য হওয়ায় হিজরী সন আবর্তিত হয় এবং ৩৩ বছরের মাথায় সৌর বছরের তুলনায় এক বছর বৃদ্ধি পায়। কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে হলে সারাদেশে একটি অভিন্ন সৌর বছরের প্রয়োজন। এই ধারণা থেকেই সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খৃস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহনের সময় অর্থাৎ ১৫৫৬ খৃস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। আকবরের নবরত্ন সভার আমির ফতেউল্লাহ খান সিরাজী বাংলা সন প্রবর্তনের কাজটি সম্পন্ন করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলী সন। পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। বৈশাখ নামটি নেয়া হয়েছিল নক্ষত্র বিশাখার নাম থেকে। ‘বিশাখা হইতে নাম হইল বৈশাখ/আরম্ভিলা গ্রীষ্মকাল ,প্রখর নিদাঘ/এই মাস হইতে বঙ্গে বর্ষ শুরু হয়/সিদ্ধিদাতা জগানন গনেশ কৃপায়”।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। ক্রমান্বয়ে নববর্ষের ব্যাপ্তি আরো বিস্তৃত হয়। রূপান্তরিত হয় লোকজ উৎসবে। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। ১৯৬৫ সাল থেকে রমনার বটমূলে প্রতিবছর ছায়ানট বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালা নগরীতে নতুন তাৎপর্য পায়। একে একে আরো অনেক সংগঠন প্রতিবছর নিয়মিতভাবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। আধুনিক জীবন-পদ্ধতির নানা উপাচারের সমারোহে খেরো খাতায় হিসাব রাখার প্রচলন এখন উঠেই গেছে। তবু বাঙালীর চিরায়ত উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখে আজ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হয় হালখাতা। মিষ্টি মুখ করান হবে ক্রেতাদের।

শহরের মানুষ এদিন পান্তা ইলিশ খাওয়ার মধ্যদিয়ে পালন করে বছরের নতুন দিনটি। তাই আসুন আমরা ও পান্তা ইলিশ খাই। আর সবার জন্য তো নববর্ষের শুভেচ্ছা রইলই।

About দূর্ভাষী

একটি উত্তর দিন