ঘুরে আসুন সেন্টমার্টিন, তবে সাবধান !

আমরা তিনজনে সেন্ট মার্টিনে অথৈই সাগরে পড়েছি। যার কোন কুল কিনারা আপাত চোখে খুঁজে পাওয়া যাচেছ না। মামা আমাদের দুইজনের দিকে রক্তচক্ষে তাকিয়ে আছে। যেন সব দোষ আমাদের দুইজনের। কিন্তু সত্যি কথা বলতে আমরা এর সাথেও নেই, পিছেও নেই। আমাদের সেন্ট-মার্টিন আসবার কোন পরিকল্পনাই ছিল না। সেন্ট-মার্টিনে আসার পরিকল্পনা মামার, সব বন্দোবস্তও মামা করেছে। মামার অগ্নিচক্ষু দেখে মনে হচেছ মামার পিছু নেওয়াটাই আমাদের দোষ হয়ে গেছে। কাধে ব্যাগ, মাথার উপর নীল আকাশ, পায়ের তলায় উত্তপ্ত বালু, পেটে ক্ষুধা, এই নিয়েই দাড়িয়ে আছি হেভেনের পাশে আশায় আশায় যদি একটু হেভেনে আমাদের জায়গা হয়। এখানে আমাদের মতো অথৈই জলে পড়া আরো ভুক্তভোগীর সাক্ষাত সত্যি বলতে আমাদের এইভাবে এতিমের মতো দাড়িয়ে থাকতে খুব বেশি খারাপ লাগছে না। আর যাইহোক, আমরা একা নই। অন্যদেরও একই কেস। গাইড ……(প্রকাশের অযোগ্য) হাওয়া হয়ে গেছে। মামার ফোন রিসিভ করছে না।
সেন্ট-মার্টিনে আমরা এসেছি প্যাকেজের আওতায়। প্যাকেজ কোম্পানি আমাদের কক্সবাজার থেকে সেন্ট-মার্টিন নিয়ে যাবে, নিয়ে আসবে, একরাত থাকার ব্যবস্থা করে দিবে এবং প্যাকেজের আওতাকালীন সময়ে তিনবেলা খাবার বন্দোবস্ত করে দিবে। এককথায় লোভনীয় অফার বলেই মনে হয়। কিন্তু সেন্ট-মার্টিনে পা দিতেই চুড়ান্ত অব্যবস্থাপনার স্বাদ পেয়ে গেছি। স্থানীয়দের দেখানো পথে হোটেল হেভেনে এসে দাড়ালাম। একদম সমুদ্রের পাশে সুন্দর পরিপটি সাজানো হোটেলটি। নিরাশার মাঝেও আমরা আশায় বুক বাঁধি। গাইডের আসতে দেরি হলেও সে না এসে যাবে কই। ফিরতি জাহাজ চারটায়। এরমধ্যে এই দ্বীপেই তো কোথাও না কোথাও থাকবে। তাকে ঠিকই খুঁজে বের করা যাবে। গাইডকে খুঁজতে হলো না। একঘন্টা বাদে সে নিজেই আরো পর্যটক সাথে নিয়ে হোটেল হেভেনে হাজির হলো এবং কোন বাক্য ব্যয় ছাড়াই আমাদের দুপুরের খাবারের জন্য খাবার টেবিলে বসিয়ে দিল। মামাও বুঝে নিয়েছে বাতচিক করে এখন আর লাভ হবে না। তাই সেও শান্ত বালকের মতো খাবার টেবিলে বসে পড়ল এবং আহারের শুরুতেই উঠে পড়ল। কারণ খাবারের মেনু মনের মতো নয়। একদিনের খাবারের মেনু খুব একটা ভালো না হলেও চলে। কিন্তু অনেক কষ্ট করে বহুদূর পারি দিয়ে প্রকৃতির যে সৌন্দর্য্য উপভোগ করবার জন্য আসলাম সেই সৌন্দর্য্য উপভোগের সময়ই যদি না পাই। আসলাম সেন্ট-মার্টিন, এখানে বসে দুপুরের খাবারও খেলাম আর কিছুক্ষন বাদেই জাহাজের হুইসেল বাজার সাথে সাথেই জাহাজে উঠে পড়লাম; তাহলে কি হইল? উপস্থিত সকলের এই মনের কথাটাই আমাদের সাথে আসা একজন পর্যটক রাগান্বিত স্বরে গাইডের কাছে জানতে চাইল। গাইড এই ধরনের কথা শুনতে অভ্যস্ত। সে শুনেও না শোনার ভান করে তার কাজ সুচারুভাবে করে যাচেছ। এই ফাকে মামা গরম দেবার সুযোগ পেয়ে গরম দিয়ে দিল। গাইড আমাদের আশ্বাস দিল আমাদের জন্য হোটেল বুকিং আছে। চিন্তার কোন কারণ নাই। নুতন এক গাইডের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। সেই আমাদের হোটেলে নিয়ে যাবে। যেনতেন হোটেল নয়, নামেই তার পরিচয়। হোটেল সোনারগা!হোটেলের নাম শুনেই আমরা মনে মনে গাইড ব্যাটাকে ক্ষমা করে দিলাম। আমাদের নতুন গাইড দশ মিনিট সমুদ্রকিনারা দিয়ে হাটিয়ে যেখানে নিয়ে আসল সেটা সোনারগা হোটেলেই বটে কিন্তু সেটা আসলে রেস্টুরেন্ট।এদের ব্যাপার-স্যাপার বোঝা দায়। শেষপর্যন্ত সোনারগা হোটেলের রান্নাঘরেই না রাত কাটানো লাগে। মামা তো আবারও অগ্নিশর্মা। পারলে গাইড ব্যাটাকেই আগুনে ভস্মিভুত করে ফেলে। মামা হোটেলের খোঁজ বাদে পুলিশ স্টেশনের খোজঁ করতে লাগল। নতুন গাইডটা বাচ্চা ছেলে। সে ভয় পেয়ে গেল। তারপরও অনেক কাহিনী।যাইহোক, শেষপর্যন্ত রাত্রে থাকবার জন্য একটা রুম আমাদের জুটে গেল। তাও বলতে গেল রাজকীয় ব্যবস্থা। গ্রামের ভিতর কটেজ। ঘরের সামনে উঠান, ব্যাডমিন্টন খেলার মাঠ, একা এক বাড়িতে আমাদের তিনজনের রাজত্ব, নিরিবিলি পরিবেশ, দারুন ব্যাপার! আমাদের যে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচেছ না এইটাতেই আমরা এখন খুশি!
তারপরের সময়টুকু নেশার ঘোরেই কাটছে। সেন্ট মার্টিনের নীল জলরাশি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাগল করা পূর্ণিমা রাতের মাদকতায় বাকি সময়টা ডুবে ছিলাম। পরদিন সকালে আমরা গেলাম ছেড়াদ্বীপে। সেন্ট মার্টিনের সাথেই লাগোয়া ছোট্ট একটা দ্বীপ। মানুষের বসতি নাই।পর্যটকরা আসেন, ঘুরে দেখেন এবং ঐদিনেই চলে যান। সেন্ট মার্টিন থেকে প্রায় একঘন্টা লাগে ছেড়াদ্বীপে যেতে। যাতায়াতের বাহন হয় ট্রলার নাহয় স্পীডবোট। আমরা ট্রলারটাই বেছে নিয়েছিলাম। আমরা টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে এসেছি জাহাজে। তাই মাঝ দরিয়ার উথাল-পাতাল ঢেউ ব্যাপারটা আসলে কি তা বুঝতে পারিনি। ট্রলারে উঠেই মাঝ সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে দেখা। ছেড়াদ্বীপটা মাত্রই জেগে ওঠা প্রবালের সমৃদ্ধ একটা দ্বীপ। ট্রলারগুলো এই দ্বীপের কিনারা পর্যন্ত যেতে পারে না। যদি দ্বীপের নিচে শক্ত পাথর কিংবা প্রবালে আঘাত লেগে টাইটানিকের মতো সাগরে ডুব দেয়। তাই দ্বীপের কিনারা থেকে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে থাকতে ট্রলারের পর্যটকদের আটজনের দলে ভাগ করে করে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় তুলে দেয়া হয়। ট্রলারে সমুদ্রের ঢেউয়ের উথাল-পাতাল নৃত্য আর কতটুকুই বা বোঝা যায়। ছোট ডিঙ্গি নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দেবার এ্যাডভেঞ্চারিয়াস মুহুর্তটি এককথায় অসাধারণ। একতালা সমান ঢেউয়ে নৌকা দোলা দোলা দুলছে। হঠাৎ নিজেকে সিনবাদ্ সিনবাদ মনে হয়। ছেড়াদ্বীপটা এককথায় দারুন সময় কেটেছে। কিন্তু বিপত্তি ঘটল ফিরে আসার সময়। আমাদের ট্রলারে তিনবছরের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এক দম্পতি পরিবারও ছিল। আমরা সবাই ছোট নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ট্রলারে উঠতে পারলেও সেই দম্পতি পরিবার আটজনের মারপ্যাচে ছেড়াদ্বীপেই রয়ে গেল। তাদেরকে অন্য এক ট্রলারের যাত্রীদের সাথে এক নৌকায় উঠানো হলো। বিপত্তি বাধল অন্য ট্রলার যাত্রীর ভাড়া নিয়ে। আমাদের ট্রলারের সাথে স্থানীয় নৌকার মাঝিদের চুক্তি আছে। কিন্তু সেই ট্রলারের সাথে স্থানীয় মাঝিদের কোন সমঝোতা চুক্তি ছিল না। তাই নৌকার মাঝি তার ন্যায্য দাবি অনুযায়ী সেই ট্রলার যাত্রীদের জন্য ট্রলার মাঝির কাছে ভাড়া চাইল। ট্রলার মাঝি ভাড়া দিতে নারাজ। মাঝ সমুদ্রে দু্ই মাঝির বৈঠা নিয়ে মারামারি। উথাল-পাতাল সমুদ্রে সে এক ভয়ংকর অবস্থা। যেভাবে নৌকা দুলছিল মনে হয় এই বুঝি মাঝ দরিয়ায় নৌকাটা ডুবে গেল। মাঝির নৌকার বৈঠার আঘাতে ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটির নাক দিয়ে রক্ত ঝরে। তাও যদি মাঝিদের হুশ হয়। আমরা ট্রলার থেকেই চেঁচামেচি করছি। ভাই আপনারা তো সবাই স্থানীয়। মাঝিতো হারিয়ে যাচেছ না। পরেও তো আমাদের পাওনার হিসেবে করতে পারেন। যদি কোন কারণে নৌকা ডুবে যায় তাহলে কি হবে ঐ দম্পতি পরিবারের। ছোট মেয়েটি আর মায়ের কান্না দেখে আমাদের খুবই খারাপ লাগছিল। এত আনন্দ করতে করতে আমরা আসছি। আর এখন ট্রলারে সবারই মন খারাপ হয়ে গেল। যাক তাও ভালো কোন রকম দুর্ঘটনা ছাড়াই আমরা সেই দম্পতি পরিবারসহ সেন্টমার্টিন দ্বীপে ফিরে আসতে পেরেছিলাম।
রুমে এসে আরেক ক্যাচাল। হোটেল বয় আমাদের রুমের সামনে ঘোরা-ঘুরি করছে। ‘ভাই কি সমস্যা?’ তার উত্তর, (এখানকার নিয়ম অনুযায়ী ন্যায্যদাবীও বলা যায়) সাড়ে এগারটা বেজে গেছে, রুম ছেড়ে দিতে হবে।রুমে ঢুকতে দেয়ালে বড় করেই লেখা ছিল ‘রুম চেক আউট ১১.৩০’। আমরা বিজ্ঞপ্তিকে পাত্তা দিইনি। আমাদের ফিরতি জাহাজ বিকাল চারটায়। আমরা এখন রুম ছাড়লে ব্যাগ কাধে নিয়ে এই সময়টা কোথায় দাড়াবো?মামা ব্যাপারটা ম্যানেজ করে ফেলল। আমরা রুম ছাড়লাম দুইটায়। সেন্টমার্টিনে জাহাজ ভেড়ে বেলা বারটায়। যারা রাত্রে থাকার জন্য আগে থেকেই রুম বুকিং নিয়ে আসছেন তাদেরো এক-দেড় ঘন্টা বাইরে লাগেজ নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে হবে। যতক্ষন না আগের পর্যটকরা রুম না ছাড়ছে। আর সাধারণত কেউ একটা বা দেড়টার আগে রুম ছাড়েও না। গতকাল আমরাও এই ভোগান্তি ভোগ করেছি তাই নতুন পর্যটকদেরও এই ভোগান্তির অধিকার আছে।
জাহাজে উঠেও নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো। প্রতিদিনই চারটা জাহাজ পর্যটক নিয়ে টেকনাফ ছেড়ে আসে আর বিকাল চারটা ঐ জাহাজই পর্যটকদের সেন্টমার্টিন থেকে নিয়ে যায়। টেকনাফ থেকে জাহাজে ওঠার আগেই ফিরতি টিকিট দিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের ফেরার দিন চার জাহাজের একটা এলো না। ঐ জাহাজের যাত্রীরা এখন কিভাবে ফিরবে? অন্য তিন জাহাজ কর্তৃপক্ষতো তাদের নিতে নারাজ। তবুও অনেককে দেখা গেল জীবনের রিস্ক নিয়ে যেকোরেই হোক লাফিয়ে তিনজাহাজের যেকোন একটাই উঠবার চেষ্টা করছে। কেউ বা সফলও হযেছে। আর যারা পারেনি তারা ভাগ্যের হাতে নিজেদের সপে দিয়ে সেন্টমার্টিনে আরেকটা দিন থেকে গেল। হয়তো আগামীকালই তাদের কর্মস্থলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল, হয়তো তাদের আর্থিক সংগতি নেই আরেকটি দিন থেকে যাবার, এখানে থাকার হোটেল পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তারপরও কিছুই করবার নেই। আরেকটা রাত এই সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করেই পেট ভরাত হবে!
এতকিছুর পরেই আমাদের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। আমাদের গাইড বেটা আমাদের তিনজনকে অন্য একগাইডের হাতে দিয়ে দিল। সেই গাইডও আমাদের কোন রকমে এক লক্কর ঝক্করে ওঠার ব্যবস্থা করে কক্সবাজার ফিরে যাবার ব্যবস্থা করল। আমরা এতেই খুশি। আর যাইহোক এতকিছুর পরেও সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য্য দর্শণ তো হল!
(আমরা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাই এখানে তুলে ধরেছি। সেন্টমার্টিন যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে আধার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সেন্টমার্টিন ভ্রমণে পদে পদে যে বিরম্বনার সম্মুখীন হতে হয় তা সত্যি অপ্রত্যাশিত। সরকারের একটু পদক্ষেপ, সুষ্ট ব্যবস্থাপনায়, দালালদের দৌরাত্ম কমাতে পারলে বাংলাদেশের বুকে এই সেন্টমার্টিনে একটু টুকরা স্বর্গের স্বাদ পাওয়া যেত।)

About আলোকিত পৃথিবী

একটি উত্তর দিন