চুপি চুপি চলে গেল ৪ঠা জুলাই

দিন আসে দিন যায়, মাস আসে মাস যায় আবার বছর এসে বছর ও চলে যায়। কিন্তু কিছু কিছু সময় বা কিছু কিছু দিন মানুষের জীবন এসন দাগ কেটে যায় যা কোন দিন ভোলা যায় না। এ দিনগুলি হতে পারে সুখের বা দুঃখের।
আমাদের (যারা সেতুর বন্ধু) জীবনে ৪ ঠা জুলাই তেমনিস একটা দিন। সেতু সম্পর্কে সা.ই. এর নিয়মিত ব্লগাররা কমবেশী জানেন। তাই আজ ওর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তেমন কিছু বলতে চাই না, শুধু বন্ধু হিসাবে সেতু কেমন সে বিষয়ে দু’একটি সম্মৃতি চারণ করব শুধু।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রথম যেদিন পা দিরাম কেউকে চিনি না, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছি বিভিন্ন জন। প্রথম ক্লাসটা কোনরকম দম বন্ধ করে পার করলাম, এরপর একটা ক্লাস গ্যাপ ছিল। সবাই একা একা ঘুরছি, যারা অবশ্য একই কলেজ থেকে একাধিক জন চান্স পেয়েছে তারা জোঁট বেধে চলছে। এমন সময় সেতু এগিয়ে এসে নিজের পরিচয় দিল এবং আমার সাথে পরিচিত হলো এবং জানতে চাইল ধূমপান এর অভ্যাস আছে কিনা, হ্যা সূচক উত্তর পেতেই জানতে চাইল কোন ব্রান্ড আমার পছন্দ। বেনসন নামটা শুনে যেন লাফিয়ে উঠল এবং ক্যান্টিনে যেয়ে সিগারেট খাওয়ার প্রস্তাব দিল। আমরা কয়েকজন আপত্তি করলাম কারন একে তো প্রথমদিন তার উপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন Ragging মারাত্নক আকার ধারণ করেছে। আশংকা প্রকাশ করতেই হেসে উড়িয়ে দিয়ে আমাদের নিয়ে গেল ক্যান্টিনে। চা সিগারেট সেরে বাকি ক্লাস করলাম এবং সেদিন থেকেই সেতুর সাথে একটা হৃদ্যতা গড়ে উঠল।
এর কয়েকদিন পরে আমাদের ব্যাচের সবচেয়ে হাবাগোবা টাইপ সুব্রত ক্লাসে আসার পথে Ragging এর শিকার হলো এবং সে আসার সময় সিনিয়ররা বলে দিল ক্লাস শেষে ক্লাসমেট মেয়ে ও অন্য কয়েকটা ছেলেকে নিয়ে যেন সে শহীদ মিনারে সিনিয়রদের সাথে দেখা করে। সুব্রত এসে আমাদের সব বললো এবং এক অজানা আশংকায় মেয়েদের মুখ যা দেখতে হয়েছিল না! 🙂
সব শুনে সেতু বললো এটা কোন ব্যাপার না আমরা কয়েকজন না সবাই যাবো, ক্লাস শেষে গেলাম সবাই মিলে শহীদ মিনারে এবং সেই সিনিয়রদের দেখা ও পেলাম। সিনিয়র রা তাদের স্বভাবসুলভ Ragging শুরু করার উদ্দেশ্যে বিশ্রী কথা বলতে শুরু করল । সেতু বিনয়ের সাথে তাদের অনুরোধ করল ভালো ব্যবহার করতে, কিন্তু কে শোনে কার কথা তারা তাদের মত অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিলো এবং সেতুকে একটা লাথি ও মারল তারা। আর তখনই অঘটনটা ঘটল!
সেতু সবার উদ্দেশ্যে শুধু বললো এভাবে অত্যাচারের শিকার না হয়ে সবাই আজ সিনিয়রদের Rag দাও। এরপর যে যা পারল তা শুরু করল। কেউ সিনিয়রদের কান টানে আবার কেউ ল্যাং মারে এমন অবস্থা। সিনিয়র রা ও নিরুপায় কারন তারা ৫ জন আর আমরা ২৯ জন। এরপর বিষয়টি নিয়ে প্রক্টর, ছাত্র বিষয়ক পরিচালক, ভি.সি. অনেক কিছুই হয়েছে। তবে এরপর থেকে আমাদের ব্যাচকে আর কেউ কোনদিন Rag দেয়ার নূন্যতম চেষ্টা করেনি।

সেতুর বিষয়ে লিখতে গেলে লেখা শেষ হবে না। তাই সে দিকে যাচ্ছি না। সেতু এখন ঢাকায় একটি বেসরকারী সংস্থায় উচ্চ পদে কাজ করছে এবং সেই সাথে পড়াশুনা ও করছে। ওর পড়া যেন কোনদিন শেষ হবে না। ছুটির দিন থাকায় কাল ওকে দাওয়াত দিয়েছিলাম আমাদের বাসায়। ছুটি হলে ও আমার ট্রেনিং থাকায় অফিসে যেতে হয়েছিল কাল। সেতু এলো সন্ধ্যা নাগাদ, এসে সেই স্বভাব সুলভ আড্ডা। ওকে চমকে দিতে গতকাল আমি আর অপরাজিতা আগে থেকেই দাওয়াত দিয়ে রেখেছিলাম সেতুর সাথে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার হওয়া আমাদের কিছু জুনিয়রদের। ওরা পাঁচজন এসেছিল। সবাই এখন যার যার জীবনে ভালো আছে। অনেকদিন পরে আমরা যেন ঢাকা শহরের ছোট একটি বাসায় আবার ফিরে পেয়েছিলাম আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসটাকে। এভাবে আড্ডায় আড্ডায় কখন যে রাত ১ টা বেজেছে কেউ টের পাইনি। ১ টার পরে ডিনার সেরে তারপর প্রত্যেকে প্রত্যেকের বাসায় চলে গেল; কিন্তু আমার ছোট্ট বাসাটা বন্ধুত্বের আর এক স্মৃতির স্বাক্ষী হয়ে রইল।

About দূর্ভাষী