Matador-1986

ভীনবাসে আছি দু’বছরের কিছু বেশি। কাজ, অফিস, বাসা এ নিয়েই প্রতিদিন। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, হৈ হুল্লোড় করা এবং পরের দিন থেকে পুনরায় সেই কাজ, অফিস, বাসা। এরি মধ্যে হঠাৎ আমার কোলকাতার এক দাদা, আমার কলিগও বটে, যে আমার কবিতা পড়ে, প্রশংসা করে এবং প্রচন্ড স্নেহও করেন, উনি আমাকে কিছু মুভির সিডি দিলেন। সেই থেকে শুরু করলাম অল্প বিস্তর ছবি দেখতে। তো দাদার দেয়া ছবিগুলো দেখলাম এবং দেখার পরে নিশ্চিত হলাম ’এ্যানটনিও বেনডারাস’ অবশ্যই আমার প্রিয় নায়কদের একজন, যদিও উত্তম কুমারকে ভুলিনা কোনক্রমেই। এরপর আমার এক প্রিয় মানুষের কথানুযায়ী শুরু হল ছবি দেখা এবং সংগ্রহ করা। নতুন সংগ্রহে মত্ত হয়ে দেখলাম আমি সত্যি সত্যিই যেন ভুলতে শুরু করেছি আমার সবচে’ প্রিয় জিনিসগুলোকে এবং নতুন সংগ্রহ ক্রমেই আমাকে টেনে নিয়ে চলেছে এমন এক জগতে, যেখানে জীবন্ত চরিত্রেরা চোখের সামনে হেঁটে-বেড়িয়ে দেখিয়ে দিতে থাকছে ভীন্ন জীবন ও অন্য বাস্তবতা।

’এ্যানটনিও বেনডারাস’-কে প্রথম দেখি ’ডেসপারেডো’ কিংবা ’ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মেক্সিকো’-তে, যেটা বছর পাঁচ-ছয় আগের কথা। নিতান্তই এ্যকশনধর্মী ছবি হিসেবে ভাল লেগে যায়। তাছাড়া স্ক্রীনে উনি এতটাই সুদর্শন ছিল যে, ’সালমা হায়েকের’ পাশে আর যে কাউকেই কুৎসিত মনে হত। অথচ পরে জানতে পারলাম স্প্যানিস চলচিত্রের একটা ইতিহাস আছে, আছে বেশ কিছু ভালো মানের ছবি এবং নিদের্শক। সেটা আরো পরের কথা। দাদার দেয়া সিডিগুলো থেকে যে দুটো ছবি দেখে আমি নিশ্চত হয়েছিলাম যে ’এ্যানটনিও বেনডারাস’ আমার প্রিয় নায়কদের একজন, তারমধ্যে ’টাই মি আপ, টাই মি ডাউন’ ছবিটা দেখে তেমন বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া তৈরী না হলেও, ’পাচো ভিলা’ দেখার পর দর্শকমাত্র নিশ্চিত হবেন, এই স্প্যানিস নায়ক শুধুমাত্র তার দর্শনধারিতার জন্য এতটা পথ আসতে পারেনি বরং ’পাচো ভিলা’-তে তার অভিনয় দেখে আমার মত তারাও নিশ্চিত হবেন, অভিনয় দক্ষতা দিয়েই তিনি উঠে এসেছেন এতটা উপরে।

এতসব গেল নায়ক বা চলচিত্র নিয়ে কথা, কিন্তু আরো পরে যখন বিশ্ব নির্দেশকদের র‌্যাঙ্কিং ঘাটতে ঘাটতে জানতে পারলাম যে, সাবকন্টিনেট থেকে শুধু মাত্র একজন নির্দেশককে বিশ্ব নির্দেশক র‌্যাঙ্কিং-এ এখনও স্বচ্ছন্দে প্রথম দশের মধ্যে রাখা হয় আর তিনি হলেন সত্যজিৎ রায়, তখন বুঝতে পারলাম, ’এ্যানটনিও বেনডারাস’ কিংবা ’পাচো ভিলা’ এসবকে ছাপিয়ে আরও বড় নায়ক হয়ে ওঠেন ’’পেডরো আলমোদোভার” কিংবা আমার আরেক প্রিয় নির্দেশক ”পিয়ার পাওলো পাসোলিনি”। বিশ্ব সিনেমায় যে ক’জন নির্দেশক খুব আলাদাভাবে নিজেদের সৃষ্টিগন্ডিকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মাত্রা দিতে পেরেছে, তাদের মধ্যে আমি ‘পাসোলিনি’ আর ‘পেডরোকে’ সবসময় আলাদা করে রাখি। যদিও ’পিয়ার পাওলো পাসোলিনির’ সবগুলো ছবি সংগ্রহ করার পরও আমি এখনও উনাকে সেভাবে বুঝে উঠতে পারিনি, তবে পেডরো আলমোদোভারের উন্মত্ত যৌনতা আর তার সাথে তুলে আনা মানুষের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মানসিক সংকট, সামাজিক প্রেক্ষাপট, বাস্তবতা, কিংবা নিজস্ব কালচারের মিশ্রণ আমাকে আকৃষ্ট করে এবং অনড় বসিয়ে রাখে স্ক্রীনের সামনে।

গতকাল রাতে ’লাইভ ফ্লেশের’ পর দ্বিতীয়বারের জন্য বসেছিলাম ’পেডরোর’ নির্দেশিত ছবি দেখতে আর সেটা হল ’ম্যাটাডোর’। ১৯৮৬ সালে নিজের লেখায় তৈরী ১১০মিনিটের এই স্প্যানিশ ছবিটি নিঃসন্দেহে পেডরোর অন্যতম সৃষ্টিগুলোর একটি, যেখানে তিনি তার চিরাচরিত সৃষ্টির মূল ধারার সাথে চমৎকারভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন স্প্যানিশ কালচারকে, বিশেষ করে স্প্যানিশ বুল ফাইট এবং ফ্যাশনকে। কিছু কিছু ছবির শুরু আমাকে এতটা চমকে দেয় যে, সেই ছবিটা শেষ না করে উঠে আসা যায়না। এর আগেরবার ‘’দি রিটার্ন’’ দেখেও তেমনটা হয়েছিল, কিন্তু সত্যি বলতে এখন পর্যন্ত আমার দেখা সমস্ত চলচিত্রের মধ্যে সবচে’ অদ্ভুত আর ব্যতিক্রমীভাবে শুরু হওয়া ছবি হল ’ম্যাটাডোর’। ছবিটা শুরু হয় একটা বিভৎস রকমের হরর ছবির টুকরো টুকরো দৃশ্য দিয়ে, যেটা দেখতে দেখতে দর্শক নিজের অজান্তেই শিউরে ওঠে এবং শিউরে ওঠাটা সম্পন্ন হয় অন্যরকম একটা বোধে, যখন ক্যামেরা এসে স্থির হয় একজন লোকের উপরে, যে টিভিটা খুব সামনে রেখে সোফায় বসে টিভির দু’পাশে পা তুলে দিয়ে সেই ভয়াবহ হরর ছবিটা দেখতে দেখতেই মাষ্টারবেট করছে।

আমি হলফ করে বলতে পারি এমন একটা দৃশ্যর কল্পনা কোন ছবির শুরুতে খুব কম দর্শক করতে পারবে যে, একটা বিভৎস রকমের হরর ছবি দেখতে দেখতে কোন মানুষ মাষ্টারবেট করছে। খুব অল্প সময়ের জন্য সেখানে ক্যামেরা স্থির হয় আর সেখান থেকে ক্যামেরা এরপর যেসব দৃশ্য চিত্রায়ন শুর করে সেটা একটা ক্লাস রুম, যেখানে একজন বিখ্যাত ষাঁড়যোদ্ধা তার ছাত্রদের শেখাচ্ছেন কিভাবে ক্ষীপ্ত ষাঁড়কে হত্যা করতে হয়, আর একিসাথে ক্যামেরা অন্যত্র এও চিত্রায়ণ করছিল, কিভাবে একজন নারী তার অভিসন্ধি পূরণের জন্য কোন পুরুষকে প্রলুব্ধ করে উন্মত্ত যৌন মিলনের সময় তাকে হত্যা করছে। দু’টো ব্যাপার একিসাথে এমনভাবে চিত্রায়ত করা হয়েছে যে, আমার মনে হচ্ছিল ক্লাসে ছাত্রদের শেখানো হত্যার কৌশলটাকেই ভিডিও ফুটেজে ওভাবে দেখানো হচ্ছে, যেখানে ষাড়টা হল পুরুষ আর যোদ্ধাটা নারী নিজে।

পেডরোর ছবিগুলোর ক্লাইমেক্স আমাকে বরাবর মুগ্ধ করে। ছবি শুরু থেকে প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তিনি যে ক্লাইমেক্সের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন দর্শকদের, সেখান থেকে অন্তত আমার মত দর্শকদের আর ফিরে আসার কোন উপায় থাকেনা এবং পুরো ১০৫ মিনিট বসে থাকার পর শেষ পাঁচ মিনিটে এসে হতে হয় স্তব্ধ। ছবির শেষ পাঁচ মিনিটের যে চিত্রায়ণ, সেটা হয়ত আরও অনেক ছবিতেই থাকতে পারে, কিন্তু সেখানে যে থীমটাকে পেডরো তুলে এনেছেন, সেটা অবশ্যই অনন্য এবং অদ্বিতীয়। পুরো ছবি দেখা শেষ হবার পর আমি পুনরায় ভাবতে বাধ্য হলাম ছবিটা নিয়ে, আর সেটা ভাবতে গিয়ে দেখি ছবিটার কয়েকটা বাক্য তখনও রয়ে গেছে মাথার মধ্যে। এক. ষাঁড় যুদ্ধের মত তুমিও বুঝিয়ে দাও (নারীকে) কে মালিক; দুই. হত্যা অন্যান্যদের কাছে খারাপ, কিন্তু নারীর কাছে সেটা ভিন্ন; তিন. প্রতিটি পুরুষ হত্যাকারীর ভেতরে একটা রমণীয় ব্যাপার থাকে, তেমনি প্রতিটি নারী হত্যাকারিণীর মধ্যে থাকে পুরোষোচিত ব্যাপার।

আমার যতগুলো প্রিয় বিষয় আছে তার মধ্যে সবচে’ প্রিয় হল ’ডার্ক সাইড অব হিউম্যান মাইন্ড’, যেখানে অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যাপারগুলোর মধ্যে অন্যতম হল পাশবিকতা। পাশবিকতা মানুষ যেভাবেই উপেক্ষা করুক না কেন, মানুষ নিজেই পাশবিকতা লালন করে এবং পছন্দও, যার বহিঃপ্রকাশ মানুষ নিজেই করে থাকে সময়, অসময়ে। আমার কেন জানি মনে হয়, মানুষের যাবতীয় পাশবিকতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল হত্যা করার প্রবণতা। অপরকে হত্যা করতে পারা বা না পারা, সেটা সবার ক্ষেত্রে না ঘটলেও, প্রতিটি সচেতন মানুষ নিদানপক্ষে নিজেকে হলেও হত্যা করে আর আমার এই ধারণা নতুন করে নিজের কাছে সত্যি প্রমাণিত হল ছবিটার শেষ মিনিটে এসে। ’এ্যানটনিও বেনডারাসের’ অভিনয় দক্ষতা দ্বিতীয়বারেরর জন্য প্রমাণিত হবার পর এও বুঝলাম, কেন পাসোলিনি, ফেলিনি, বার্গম্যান, কুরোশাওয়া কিংবা আলমোদোভারের মত নির্দেশকরা তাদের বেশিরভাগ ছবিতেই একি অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে ব্যবহার করেছেন। ভাল থাকুন, ভাল ভাল ছবি দেখুন। যারা ছবিটা ডাউনলোড করতে চান, তারা [link|http://thepiratebay.org/torrent/3713596/Matador_-_Almodovar1986XviDCVP102EngSubs|এখান থেকে টরেন্ট] নামিয়ে করতে পারেন। অন্যান্য তথ্য [link|http://www.imdb.com/title/tt0091495/|পাবেন এখানে] ।

About অ রণ্য

৩ comments

  1. ভালো পোস্ট। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না। সেটা হচ্ছে ভিনদেশে গিয়ে যদি মুভি দেখা যায়, তবে বই পড়া যায় না কেন?

  2. ভালো পোস্ট। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না। সেটা হচ্ছে ভিনদেশে গিয়ে যদি মুভি দেখা যায়, তবে বই পড়া যায় না কেন?

  3. বই সংগ্রহ করতে পারিনা এখানে। আর সত্যি বলতে কি মুভি তাও অর্ধেক দেখে রেখে দিতে পারি, কিন্তু বই পারিনা। বই ম্যানিয়াটা মুভি ম্যানিয়ার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

    তারপরও এবার ভাবছি, কিছু বই আনতেই হবে, কোন উপায় নেই।

  4. বই সংগ্রহ করতে পারিনা এখানে। আর সত্যি বলতে কি মুভি তাও অর্ধেক দেখে রেখে দিতে পারি, কিন্তু বই পারিনা। বই ম্যানিয়াটা মুভি ম্যানিয়ার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

    তারপরও এবার ভাবছি, কিছু বই আনতেই হবে, কোন উপায় নেই।

একটি উত্তর দিন