আমার বাবার স্মৃতি

বাবা, আমার আজ আর আমাদের মাঝে নেই। ১৯৯৮ সালের ১৭ আগষ্ট তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন এমন এক জগতে যেখান থেকে কেউ আর ফিরতে পারেন না।
আমার বাবা ছিলেন খুব সহজ সরল একজন মানুষ। মাতবর বাড়ির বড় ছেলে হয়ে ও যিনি কোনদিন কোন সালিশীতে অংশগ্রহণ করেন নি। সরকারী চাকুরী করতেন, দূরে পোস্টিং হলো হঠাৎ, তখন আমার দাদা-দাদী খুবই অসুস্থ, তাই চাকুরীই ছেড়ে দিলেন, আমি তখন মাত্র দেড় বছরের।
এরপর বাবাকে করতে হয়েছে অমানুষিক পরিশ্রম। পৈর্তৃক সূত্রে প্রাপ্ত জমিজমার অভাব ছিল না। তাই চাকুরী ছেড়ে গৃহস্থালী দেখাশুনা করতে লাগলেন। এর মাঝে হঠাৎ একদিন আমার গ্রান্ডফাদার মারা গেলেন। স্বভাবতই মুসলমান যৌথ পরিবারের ভাঙ্গনের সুর বেজে উঠল। উল্লেখ্য আমার বাবারা দুই ভাই। মুরব্বীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিন ঠিক হলো সংসার আলাদা করার। বাবা ও মেনে নিলেন, কিন্তু তখন তিনি বুঝতে পারেন নি কতটা দূর্ভোগ তার জন্য অপেক্ষা করছে। নির্ধারিত দিনের পূর্ব রাতে ডাকাত পড়ল আমাদের বাড়িতে। আর এমন ই ডাকাতি হলো পরদিন সকালে আমাদের কলাপাতায় ভাত খেতে হলো। কিন্তু বছর পাঁচেক পরে ডাকাতি হওয়া গহনা সহ অনেক তৈজসপত্র পাওয়া গেল আমার চাচার ঘরে।
এরপর বাবা ছোট খাট ব্যবসা শুরু করেন এবং যে জমাজমি ছিল তা চাষবাস করে মোটামুটি চলতে লাগল আমাদের সংসার। দুইভাই, এক বোন, বাবা মা আমার দাদীকে নিয়ে আমাদের সংসার। মধ্যবিত্ত পরিবারের চিরায়ত ঝামেলা আমাদের সংসারে ও ছিল। বাবা সবসময় চেষ্টা করেছেন তার সন্তানদের যত্ন নিতে, মানুষের মত মানুষ করতে।
আমাদের ছোট বেলায় আমাদের তিন ভাইবোনের কোন টিউটর ছিল না। বাবা নিজে আমাদের পড়াতেন এবং আমরা দুইভাই এসএসসি পর্যন্ত তাঁর কাছেই পড়েছি। আর বাবা তার শিক্ষাদানে সফল ছিলেন কারন আমরা তিন ভাই বোনই ফাইভে এবং এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছি।
ছোটবেলা থেকে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন আমার বাবা। রাতে বাবার কাছে ঘুমাতে না পারলে ঘুম হতো না। বাবা আমার পাশে না বসলে আমার খাওয়া হতো না। বাবা পড়াতে না বসলে আমার পড়া হতো না। এভাবে আমি বাবার একবারে ছায়াসংগী হয়ে উঠলাম।
বাবা আমাদেরকে প্রচন্ড স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কখন ও নিজের কোন সিদ্ধান্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দিতেন না, বরং যে বিষয়ে তিনি বলছেন তার ভালো এবং মন্দ দুইটা দিকই তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরতেন এবং আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে বলতেন । বাবা ছিলেন আমার বন্ধু। আমার মনে আছে কলেজে পড়ার সময় এক সহপাঠীর উপর আমি খুবই রেগে যাই এবং তাকে মারব বলে সিদ্ধান্ত নেই এবং বাবাকে বলি আমি ঐ সহপাঠিকে মারব। কিন্তু কি আশ্চর্য! বাবা একটু ও রেগে গেলেন না, বরং বুঝালেন মারলে কি লাভ আর না মারলে কি লাভ এবং বললেন এখন কি করবা তুমি সিদ্ধান্ত নাও।
এমন মানুষটা তার ছেলেদের সফলতা নিজে চোখে দেখে যেতে পারেন নি। ১৯৯৮ সালের আগস্ট মাসে বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন, অবশ্য আগে থেকেই ডায়েবেটিস এ ভূগছিলেন তিনি। ১৫ দিন ক্লিনিকে থাকার পর ১৭ আগস্ট বিকাল সাড়ে পাঁচটায় প্রাণপ্রিয় বাবা আমাদের সামনে দিয়েই চলে গেলেন অন্যজগতে। এই ১৫ টা দিন একমুহুর্ত বাবা আমাকে তার কাছ থেকে সরতে দেননি। ক্লিনিকেই আমাকে সারতে হয়েছে আমার গোসল, খাওয়া, ঘুম; না এ নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নেই, কিন্তু মাত্র ৫২ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন এবং যখন গেলেন তখন তার মাথার নীচে আমাদের দু ভাইয়ের হাত আর সামনে মা ও আমার ছোটবোন এবং আর ও অনেক আত্নীয় স্বজন।

আজ, বাবার উদ্দেশ্যে শুধু বলতে ইচ্ছা করছে, বাবা তুমি কি পার না আমাদের মাঝে আমার ফিরে আসতে, আজ ১১ টা বছর তোমাকে ছাড়া আমরা কেমন আছি তোমাকে বলে আমি বোঝাতে পারব না।

About দূর্ভাষী

One comment

  1. আপনার বাবা যে সহজ সরল ছিলেন এইটা জেনে ভালো লাগলো। আমি আপনার বাবার জন্যে দোওয়া করছি।
    এইবার আমার বাবার কথা একটু শুনুন।
    তিনি যে অসৎ এইটা বুঝতে কষ্ট হয় না। বিশেষ করে টাকা পয়সার ব্যাপারে। মদ খান কিনা জানিনা তবে ঘুষ খান। আমার মায়ের গায় হাত দেন। গালিগালাজ করেন। আবার মসজিদে টাকা দেন, জুমাবারের নানামজও পড়েন। এই লোকটাকে শ্রদ্ধা করতে পারলাম না।

  2. আপনার বাবা যে সহজ সরল ছিলেন এইটা জেনে ভালো লাগলো। আমি আপনার বাবার জন্যে দোওয়া করছি।
    এইবার আমার বাবার কথা একটু শুনুন।
    তিনি যে অসৎ এইটা বুঝতে কষ্ট হয় না। বিশেষ করে টাকা পয়সার ব্যাপারে। মদ খান কিনা জানিনা তবে ঘুষ খান। আমার মায়ের গায় হাত দেন। গালিগালাজ করেন। আবার মসজিদে টাকা দেন, জুমাবারের নানামজও পড়েন। এই লোকটাকে শ্রদ্ধা করতে পারলাম না।

একটি উত্তর দিন