ডিজিটালের প্রভাবে সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ কি হুমকির মুখে?

অনলাইন জার্নালিজমের সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে অনলাইন জার্নালিজমের দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই। এমনকি প্রায় প্রতিটি দৈনিক পত্রিকারই মুদ্রণের পাশাপাশি ইন্টারনেট সংস্করণ রয়েছে। কিন্তু এ ইন্টারনেট সংস্করণ ও অনলাইন জার্নালিজমই যেন কাল হয়ে দাঁড়ালো সংবাদপত্রের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসসহ আরো বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আশঙ্কা করা হচ্ছে, অনলাইন জার্নালিজম বা ইন্টারনেটে সংবাদ পড়ার সুবিধার ফলে এক সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে সংবাদপত্রের মুদ্রণ কাজ।
বিখ্যাত ম্যাগাজিন টাইমের প্রচ্ছদ রচনার বিষয়বস্তু ছিল কীভাবে আপনার সংবাদপত্র রক্ষা করবেন”। ম্যাগাজিনের ওই সংখ্যায় টাইমের সাবেক সম্পাদক ওয়ালটার নতুন এক পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন, যার মাধ্যমে ইন্টারনেটে সংবাদ পাঠকদের অনলাইনে সংবাদ পড়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হবে। তিনি “মাইক্রো-পেমেন্ট”-এর মাধ্যমে অর্থ দেয়ার কথা বলেন। একইভাবে স্বনামধন্য দৈনিক পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসও “সংবাদপত্রের জন্য যুদ্ধপরিকল্পনা” শীর্ষক শিরোনামে একটি বিশেষ রচনা প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে, বেশকিছু বিখ্যাত ব্লগারের অনলাইনে বিনামূল্যে বিজ্ঞাপনের সুবিধা দেয়ার কারণে সংবাদপত্রের অন্যতম লাভজনক ব্যবসা “শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন” আজ প্রায় ধ্বংসের পথে। এ অবস্থায় আমেরিকায় সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদপত্রের মুদ্রিত প্রকাশনায় বিজ্ঞাপন হচ্ছে অন্যতম লাভজনক একটি ব্যবসা। কিন্তু সংবাদপত্রের বিক্রি কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞাপনদাতাও বিজ্ঞাপন দেয়া কমিয়ে দেন। ঠিক এমনটাই ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্ট মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিজে। প্রায় সব পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ মানুষই বিনামূল্যে সংবাদ পড়ার জন্য পত্রিকা না কিনে ওয়েবসাইটে চলে যায়। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে পত্রিকার ওপর। পত্রিকাগুলো তাদের অনলাইন সংস্করণের জন্যও বিজ্ঞাপন পাচ্ছে, তবে তা মুদ্রিত বিজ্ঞাপনের কমার হারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অর্থাৎ, সবমিলিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ প্রকাশের পুরনো মাধ্যম সংবাদপত্র।
‘টাইম’ কর্তৃক প্রকাশিত মাইক্রো-পেমেন্ট সিস্টেমটি একটি সমাধান হতে পারে; কিন্তু এ পরিকল্পনার সঙ্গে একমত হতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সংবাদপত্রগুলো। এমনকি নিউইয়র্ক টাইমস নিজেও সিদ্ধান্তহীনতা বা দোটানায় ভুগছে। এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্ট মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিজে। বিতর্কের বিষয়বস্তু এই যে, বিনামূল্যে ইন্টারনেটে সংবাদ পড়ার সুযোগ পেয়েও একজন পাঠক অর্থের বিনিময়ে সেই ইন্টারনেটেই সংবাদপত্রের ওয়েবে প্রকাশিত সংবাদ পড়বেন কি না।
এদিকে যে পরিকল্পনার কথা ভাবছে টাইমসসহ অন্য সংবাদপত্রগুলো, তার সফল বাস্তবায়ন করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নামের আরেক বিখ্যাত সংবাদপত্রের ওয়েবসাইট। ২.২৯ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে পুরো সপ্তাহ সংবাদ পড়ার সুযোগ দিচ্ছে তারা। অবশ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের নতুন এ সিস্টেমটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। তবে সফলতা যে সবার ভাগ্যে জোটে না, সে কথা ভুলে যেতে পারছে না অন্য সংবাদপত্রগুলো।
সাম্প্রতিক সময়ে পাঠকদের সঙ্গে অনলাইনে প্রশ্নোত্তর পর্বে নিউইয়র্ক টাইমসের কার্য নির্বাহী সম্পাদক বিল কেলার বলেন, তার পত্রিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিশেষ কিছু প্রবন্ধ, রচনা, প্রতিবেদন কিংবা অন্য তথ্যাদি একটি পে-ব্যারিয়ারের মধ্যে রাখতে পারে। অর্থাৎ, শুধু মূল্য পরিশোধের মাধ্যমেই পাঠক বা ভিজিটর তথ্যগুলো পেতে পারেন। তার মতে, সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা কখনো কখনো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র থেকে আনা হয় এবং যার সত্যতা যাচাই করে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে প্রকাশ করা হয়, এমন প্রতিবেদনগুলো পড়ার জন্য আগে মূল্য পরিশোধ করা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। মাত্র দুই বছরেরও কম সময় আগে ঠিক এমনই একটি পদ্ধতি পরীক্ষা করেছিল ‘টাইম’ যার নাম ছিল ‘টাইমস-সিলেক্ট’। কিন্তু সেবার এ পদ্ধতিটি ব্যর্থ হয়। আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি পাঠকের কাছ থেকে। ব্যর্থ হওয়ার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আবারো একই পদ্ধতি চালু করা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও প্রকাশনা জগতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই বোধহয় এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে টাইমসসহ বেশকিছু সংবাদপত্র। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও পাঠকরা কিভাবে মূল্য পরিশোধ করবেন সেটা এখনো ঠিক হয়নি। টাইমসের প্রচ্ছদ রচনায় ওয়ালটার বলেছেন, ‘আমি মনে করি পাঠকদের তথ্য বা সংবাদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে অর্থ দেয়ার পদ্ধতিটি হতে হবে আইটিউনসের মতো সহজ, দ্রুত ও আকর্ষণীয়’। আইটিউনস অ্যাপলের আইফোন ব্যবহারকারীদের জন্য একটি স্টোর, যেখান থেকে গান কিনে তারপর ডাউনলোড করা যায়। আইটিউনসে গান কেনার জন্য মূল্য দেয়া খুবই সোজা। এটিও এক ধরনের মাইক্রো-পেমেন্ট সিস্টেম।
টাইমসের ওয়েবসাইট প্রতি মাসে প্রায় বিশ মিলিয়ন ভিজিটর পেয়ে থাকে, এমন তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোর্ট টিভির প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ব্রিল প্রতিটি আর্টিকেল বা প্রতিবেদনের জন্য ১০ সেন্ট, একদিনের জন্য ৪০ সেন্ট, এক মাসের জন্য ৭.৫০ ডলার এবং এক বছরের সাবস্ক্রিপশনের জন্য ৫৫ ডলার মূল্যমান প্রস্তাব করেছেন।
মাইক্রো-পেমেন্ট সিস্টেম নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই বলছেন, নতুন এ আইডিয়া সংবাদপত্রের ডেথ-স্পাইরালকে ত্বরান্বিত করা ছাড়া আর কিছুই করবে না। সাংবাদিক স্টিভ আউটিংও এ ধারণার সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, ‘এ সিস্টেম সফল হয়নি, হবেও না। কেননা, সিস্টেমটি ইন্টারনেটের প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচরণ করে। ইন্টারনেটে আজকাল মানুষ প্রায় সবকিছুই বিনামূল্যে পাওয়া শুরু করেছে। এমন সময় পে-ব্যারিয়ারের সৃষ্টি মোটেই সংবাদপত্রের ভবিষ্যতের জন্য সুফল বয়ে আনবে না’।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন আউটিং। পে-ব্যারিয়ার বা অর্থের বিনিময়ে পার হওয়া যায় এমন প্রতিবন্ধকতার আড়ালে কোনো সংবাদ থাকলে তা গুগলের মতো সার্চ ইঞ্জিন ইনডেক্স করতে পারবে না। ফলস্বরূপ, সার্চ রেজাল্টেও সহজলভ্য হবে না প্রতিবেদনগুলো। অধিকাংশ মানুষই সংবাদ খুঁজে বের করার কাজে সার্চ ইঞ্জিনের সাহায্য নিয়ে থাকেন।
এ দৃষ্টিকোণ থেকে পে-ব্যারিয়ার সৃষ্টি করা মানে সার্চ ইঞ্জিন তথা পুরো ইন্টারনেট জগৎ ও বিপুল সংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী থেকে কয়েক ধাপ দূরে সরে আসা।
প্রতিটি আর্টিকেলে মূল্য না ধরে পাঠকদের “ভ্যালুয়েবল অনলাইন কনটেন্ট” সাপোর্ট করার উদ্দেশ্যে মাসিক ফি দিতে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন স্টিভ আউটিং।
এদিকে লস এঞ্জেলেসের এক ব্লগার অনলাইনে ব্যতিক্রমী এক পিটিশন খুলে বসেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সব সংবাদপত্রের ওয়েবসাইট জুলাইয়ে নন-পেয়িং ভিজিটরদের জন্য এক সপ্তাহ বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার এ পিটিশন সফল হলে সংবাদপত্রগুলো আগামী জুলাইয়ে তাদের ইন্টারনেট সংস্করণ নন-পেয়িং ভিজিটরদের জন্য বন্ধ রাখতে পারে।
প্রযুক্তির নিত্যনতুন উদ্ভাবন জীবনযাত্রাকে গতিময় করে দিচ্ছে ঠিকই, তবে কেড়ে নিচ্ছে ঐতিহ্যবাহী অনেক কিছুই। যেমন এক সময়ের ব্যক্তিগত চিঠি আদান-প্রদানের প্রথা বা অভ্যাস পরিবর্তন করে দিয়েছে আজকের দ্রুতগামী ইমেইলের ব্যবহার। তেমনিভাবে এক সময়ের সকালের নাশতার সঙ্গে সংবাদপত্র পড়ার দৃশ্যও হয়তো পাল্টে দেবে আজ এবং আগামীর অনলাইন জার্নালিজম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্ট মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিজে সৃষ্ট সাম্প্রতিক চিত্র যেন এমনটাই ইঙ্গিত করছে।

প্রথম প্রকাশঃ দৈনিক যায়যায়দিন।

About আমিনুল ইসলাম