গণতন্ত্র ও ইসলাম

গণতন্ত্রের স্বরূপ ও বাস্তবতা: একটি পর্যালোচনা
মূল (ইংরেজী): আব্দুল কাদির বিন আব্দুল আযীয

গণতন্ত্র ও এর উৎসঃ
গণতন্ত্র জনগণের প্রভূত্বের (mastership) শাসন ব্যবস্থা। যে প্রভূত্ব এক নিরংকুশ ও এক চূড়ান্ত ক্ষমতাকে বুঝায়। এ ক্ষমতা জনগণকে সেই অধিকার দেয় যার মাধ্যমে তারা তাদের নেতা নির্বাচন করতে পারে এবং তাদের ইচ্ছা অনুসারে যে কোন আইন প্রণয়ন করতে পারে।
সাধারণতঃ জনগণ এই ক্ষমতার চর্চা করে প্রতিনিধি হিসাবে আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত করার মাধ্যমে, যারা তাদের পক্ষ থেকে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করবে এবং তাদের দেয়া ক্ষমতার অনুশীলন করবে। আর এই প্রভূত্ব এমন এক নিরংকুশ কতর্ৃত্ব যার উপর আর কোন কর্তৃত্বের অস্তিত্ব নেই। একজন পশ্চিমা রাজনীতিবিদ যোসেফ ফ্রাংকেল বলেন, (mastership) এমন নিরংকুশ কর্তৃত্বকে বুঝায় যা তার উধের্্ব অন্য কোন কতর্ৃত্বকে স্বীকার করে না।
Parliament শব্দটি ফ্রেঞ্চ Parler শব্দ থেকে উদ্ভূত যার অর্থ কথা বলা। মধ্যযুগীয় রাজারা রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি নিয়ে পরামর্শ করার জন্য প্রতিনিধিত্বশীল উপদেষ্টাদেরকে রাজসভায় আহবান করতেন।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটি প্রথম ইংল্যাণ্ড ও ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। অতঃপর তাদের প্রভাবে অন্যান্য দেশেও এটি ছড়িয়ে পড়ে।
মূলতঃ ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন হয়। আর সংসদীয় পদ্ধতি তারও এক শতাব্দী পূর্বে ইংল্যাণ্ডে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। আদর্শিকভাবে জাতির উপর প্রভূত্বের নীতি- যেটা গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার মূলভিত্তি তা ফরাসী বিপ্লবের পূর্বে কয়েক দশক ধরে বিকাশ লাভ করেছিল। তা প্রতিভাত হয়ে উঠেছিল জন লক, মন্টিস্কু এবং জ্যঁ জ্যাক রূশোর লেখনীর মাধ্যমে, যিনি ‘সামাজিক চুক্তি’ মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা যে মতবাদ ‘জাতির উপর প্রভুত্ব’ তত্ত্বের ভিত্তিরূপে পরিগণিত। আর এটা ছিল ইউরোপের বুকে প্রায় এক হাযার বছর ধরে ব্যাপকভাবে চলমান ‘ঐশ্বরিক প্রতিনিধিত্ব’ মতবাদের বিরুদ্ধে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও বৈরিতার যুদ্ধংদেহী প্রকাশ। কেননা সে মতবাদটি নির্ধারণ করে দিয়েছিল যে, রাজারা ইশ্বরের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। ফলশ্রুতিতে, ধর্মযাজকদের (রোমান ক্যাথলিক চার্চ) সমর্থনে রাজারা একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়।
বস্তুতঃ ইউরোপীয় জনগণ এই একচ্ছত্র শাসনে দারুনভাবে জর্জরিত হয়। সে অনুযায়ী তাদের জন্য এই প্রভূত্ত্বের চেয়ে সমগ্র জাতির কর্তৃত্ব (The Mastership of the nations তত্ত্ব সর্বোত্তম বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় যাতে তারা রাজা ও ধর্মযাজকদের- যারা শাসন পরিচালনায় নিজেদের জন্য ইশ্বরের প্রতিনিধিত্বের দাবী করত তাদের চরম আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে পারে। এজন্য মূলতঃ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল খোদায়ী কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসাবে এবং মানুষকে সমস্ত ক্ষমতার মালিক বানিয়ে কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই স্বীয় জীবন পরিচালনার পথ খোলাসা করার জন্য।
‘ঐশ্বরিক প্রতিনিধিত্ব’ থিওরীর বিরুদ্ধে জাতির প্রভুত্ত্বের এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাও শান্তিপূর্ণ হয় নি। বরং এ মতবাদের বাস্তবায়ন ঘটেছিল পৃথিবীর অন্যতম একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসী বিপ্লবের মূলমন্ত্রই ছিল ‘সর্বশেষ রাজার ফাঁসি দাও সর্বশেষ যাজকের নাড়ি-ভঁূড়ি দিয়ে’। কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল নিয়ে ফরাসী বিপ্লব শেষ হয়। বস্তুতঃ সেবারই প্রথমবারের মত খৃষ্টান ইউরোপের ইতিহাসে একটি ধর্মহীন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এর দার্শনিক ভিত্তি ছিল ইশ্বরের পরিবর্তে মানুষের নামে শাসন পরিচালনা, ক্যাথলিকবাদের পরিবর্তে বিশ্বাসের স্বাধীনতা, ধমর্ীয় বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে ব্যক্তি স্বাধীনতা (Indivisualism) আর গীর্জার সিদ্ধান্তের পরিবর্তে মানুষের তৈরী আইন।
বাস্তবিকঅর্থে ফরাসী বিপ্লবের মূলনীতিসমূহ ও তার শাসন পরিচালনা প্রক্রিয়ার মাঝেই জাতির প্রভুত্ত্ব মতবাদ ও আইন রচনায় তার অধিকার প্রতিভাত হয়। ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দের মানবাধিকার ঘোষনার ৬ষ্ঠ বিধানে অনুরূপই বর্ণিত হয়েছেঃ ‘জাতির ইচ্ছার অভিব্যক্তিই হলো আইন’। এর অর্থ হ’ল আইন আর চার্চ বা আল্লাহর ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ নয়। ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দে ফরাসী শাসন পরিচালনা নীতির সাথে প্রণীত মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি ঘোষনার ২৫তম বিধিতে বলা হয়েছে, ‘শাসনক্ষমতা জনগণের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত’। এজন্য আব্দুল হামিদ মিতওয়ালী বলেন, আসলে ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে ফরাসী বিপ্লবের নীতিমালাসমূহই পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক নীতিমালার ভিত্তি গড়ে দেয়।
গণতন্ত্র, সংসদ সদস্য (এম,পি) এবং ভোটারদের ব্যাপারে ইসলামের বক্তব্যঃ
গণতন্ত্র হ’ল সর্বোচ্চ ক্ষমতা যা তার উপরে অন্য কোন ক্ষমতার অস্তিত্বকে স্বীকার করে না। কেননা এই ক্ষমতা স্বয়ংভূত ও সর্বেসর্বা। ফলে এটা কারো নিকট দায়বদ্ধ না হয়ে নিজে ইচ্ছামত যা খুশী করতে পারে ও নিজের ইচ্ছা মত আইন প্রণয়ন করে থাকে। অথচ এই নিরংকুশ ক্ষমতাবৈশিষ্ট্য কেবল আল্লাহর কাছেই সীমাবদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ++++++ অর্থাৎ আল্লাহ আদেশ করেন, তাঁর আদেশ রদ করবার কেউ নাই এবং তিনি হিসাব গ্রহণে অতি তৎপর’ (সূরা রা’দ ১৩/৪১)। তিনি আরো বলেন, +++++ অর্থাৎ ‘নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা আদেশ করেন’ (সূরা মায়েদাহ ৫/১)। তিনি বলেন, +++++ ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন’ (সূরা হজ্জ্ব ২২/১৪)।
এ থেকে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, গণতন্ত্র মানুষকে আইন প্রণয়নের নিরংকুশ ক্ষমতা দান করে মানুষের উপর প্রভূত্বের (উলুহিয়্যাত) বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছে। ফলে এটা আল্লাহর পরিবর্তে মানুষকেই ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে এবং সৃষ্টির জন্য আইন প্রণয়নের অধিকারে আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করেছে। ফলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এটা কূফরে আকবর (যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়)। আরো সংক্ষেপে বলা যায় গণতন্ত্রে নতুন খোদা হচ্ছে মানুষের কামনা-বাসনা যা আইন প্রণয়নে কোন বাধা ছাড়াই আপন খেয়াল-খুশীর প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে।
আল্লাহ বলেন, ++++++ ‘তুমি কি দেখ না তাকে যে, তার কামনা-বাসনাকে ইলাহ রূপে গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার কর্ম বিধায়ক হবে? তুমি কি মনে কর যে, তাদের অধিকাংশ শুনে ও বুঝে! তারা তো পশুর মতই। বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট’ (ফুরকান ২৫/৪৩-৪৪)।
ফলে গণতন্ত্র একটি স্বপ্রতিষ্ঠিত ধর্মের রূপ লাভ করেছে, যে ধর্মে জনগণই যাবতীয় ক্ষমতার অধিকারী। অপরদিকে ইসলাম ধর্মে আল্লাহই সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ-ই সকল ক্ষমতার মালিক’ =(সুনানে আবুদাঊদ, আল-আদাব অধ্যায়, হাদীছ ছহীহ)।
একজন খ্যাতিমান ব্যক্তির উক্তিঃ
‘পাশ্চাত্য সভ্যতা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্র নামক তিনটি মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে তৃতীয় নীতিটা হ’ল গণতন্ত্র যা মানুষকে প্রভুত্বের আসনে বসিয়ে, পূর্ববর্তী দুটো নীতির সাথে যুক্ত হয়ে বিশ্বব্যাপি দুঃখ-দুর্দশা ও উদ্বিগ্নতার যে চিত্রটি একে পরিবেষ্টন করে রয়েছে তার পূর্ণতা সাধন করেছে। এর মাধ্যমেই একটি এলাকার অধিবাসী তাদের সমাজ কল্যাণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরোপুরি স্বাধীন এবং একইভাবে সে স্থানের আইন রচনাতেও তাদের ইচ্ছারই প্রতিফলন হয়।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যা মানুষকে আল্লাহ্র ইবাদত, তাঁর আনুগত্য ও ভয় এবং নৈতিক আচরনের সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণবিধি থেকে মুক্ত করেছে। তাকে যথেচ্ছা আচরণের সুযোগ করে দিয়েছে এবং কোন দায়িত্ববোধের তোয়াক্কা না করে তাদেরকে তাদের নিজেদেরই দাস বানিয়ে ফেলেছে। অতঃপর ঘধঃরড়হধষরংস বা জাতীয়তাবাদ এসে তাদেরকে অহংকার, ঔদ্ধত্য এবং অন্যের প্রতি অশ্রদ্ধা ও আত্মস্বার্থপরতার উপচে পড়া নেশায় মাতাল করে তুলেছে। পরিশেষে গণতন্ত্রের আর্বিভাব হয়েছে, মানুষকে অসীম স্বাধীনতা দান করে, স্বেচ্ছাচারিতার গোলাম বানিয়ে এবং আত্মপরতায় মদমত্ত রেখে তাকে প্রভূত্বের আসনে বসাতে। এভাবে গণতন্ত্র মানুষকে কর্মক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের সার্বিক ক্ষমতাপ্রদান এবং শাসনপদ্ধতি প্রবর্তনের পূর্ণ স্বাধীনতা দান করে তাকে তার যাবতীয় চাহিদা পুরণের সার্বিক কর্তৃত্ব ন্যস্ত করেছে।
জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং গণতন্ত্র মুসলমানের গৃহীত আদর্শবাদী ধর্মের পরিপন্থী ও রীতিমত সাংঘর্ষিক। অতএব যদি আপনি এর কাছে আত্মসমর্পন করেন, তবে ব্যাপারটা এমন দাড়াবে যেন আপনি আল্লাহ্র কিতাবকে আপনার পশ্চাতে নিক্ষেপ করলেন এবং যদি আপনি এর প্রতিষ্ঠাদান কিংবা সুরক্ষায় অংশগ্রহণ করেন তাহলে বস্তুতঃ আপনি যেন আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। সুতরাং যেখানেই এই পদ্ধতি বিরাজমান সেখানে ইসলাম থাকতে পারে না। আর যেখানে ইসলাম আছে সেখানে এই পদ্ধতিরও কোন স্থান নেই।’
উপরিউক্ত আলোচনাটি জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক নেতা অধ্যাপক আবুল আ’লা মওদুদীর। দুঃখজনক হ’লেও সত্য যে, পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামী গণতন্ত্রকে পদ্ধতিগতভাবে গ্রহণ করেছে এবং পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। অথচ তাঁর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃতু্যর পর ও অদ্যবধি পাকিস্তান একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। আল্লাহ বলেন,
+++++++++++
‘তোমরা যা কর না তা বল কেন? তোমরা যা কর না তোমাদের তা বলা আল্লাহ্র দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক’ (সাফ্ ৬১/৩)। আল্লাহ আরো বলেন, +++++++ ‘তোমরা কি মানুষকে সৎ কর্মের নির্দেশ দাও, আর নিজেরা বিস্মৃত হও? অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর। তবে কি তোমরা বুঝ না? (বাক্বারাহ ২/৪৪)।
যেহেতু গণতন্ত্রে জনগণই সাবভৌমত্বের মালিক এবং তারাই পার্লামেন্টে প্রতিনিধি প্রেরণের মাধ্যমে এই ক্ষমতার অনুশীলন করে, অতএব সংসদ সদস্য এবং যারা তাদেরকে এ দায়িত্ব পালনের জন্য ভোট দেয় উভয় পক্ষই কুফরীতে নিমজ্জিত। এম.পিদের কূফরীর কারণ হ’ল তারাই কার্যত প্রভুত্ত্বের মালিকানা ভোগ করে এবং তারাই আল্লাহকে বাদ দিয়ে মানুষের জন্য আইন প্রণয়ন করে, হৌক তা আইন প্রস্তুত করার মাধ্যমে অথবা তাতে সম্মতি দান করার মাধ্যমে। অধিকন্তু সকল আধুনিক সেক্যুলার শাসন ব্যবস্থা অনুযায়ী ‘আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতেই ন্যস্ত’ এর নাম হাউস অব কমনস, ন্যাশনাল এসেম্বলী, কংগ্রেস, লিজেসলেটিভ এসেম্বলী অথবা অন্য যা কিছুই হৌক না কেন। এটা এম.পিদেরকে আল্লাহ্র রুবুবিয়্যাতের অংশীদার বানিয়ে দেয় (অর্থাৎ মানব জাতির জন্য আইন রচনার একক অধিকারে, যা আল্লাহর অন্যতম একটি কাজ)।
আল্লাহ বলেন, +++++++++++ অথবা ইহাদের কি এমন কতকগুলো দেবতা আছে যারা ইহাদের জন্য বিধান দিয়াছে এমন দ্বীনের, যার অনুমতি আল্লাহ দেন নাই’ (আশ শূরা ৪২/২১)।
ধর্মের একটি অর্থ হলো ‘মানুষের জীবন ব্যবস্থাপনা’ হৌক তা সত্য কিংবা মিথ্যা। কারণ আল্লাহ বলেন, +++ অথবা ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য এবং আমার ধর্ম আমার জন্য’ (কাফেরুন ১০৯/৬)। এখানে কাফিররা যে কুফর-এর উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল আল্লাহ তা’আলা তাকেও ‘ধর্ম’ বলেছেন। অতএব মানুষের জন্য কেউ আইন প্রণয়ন করলে সে মূলতঃ যেন তাদের উপর প্রভূত্বের আসনে আসীন হল এবং আল্লাহ্র সাথে নিজেকে শরীক করল। এ হ’ল একটি প্রমাণ।
এম.পি-দের কুফরী আচরণের ব্যাপারে আরেকটি প্রমাণ হ’ল মানুষের জন্য আইন রচনা করে তারা আল্লাহর পাশাপাশি তাদের নিজেদেরকেও প্রভূত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। আর এটা যেন আল-কুরআনে উল্লেখিত কুফরের ঠিক অনুরূপ। আল্লাহ বলেন,
+++++++
অর্থাৎ তুমি বল ‘হে কিতাবীগণ! এস সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক। যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত না করি, কোন কিছুতেই তাঁর শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকেও আল্লাহ ব্যতীত রব হিসাবে গ্রহণ না করে। যদি তারা মুখ ফিরাইয়া নেয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা মুসলমান’ (্আলে-ইমরান ৩/৬৪)।
প্রকৃতপক্ষে উপরোক্ত আয়াতে উলি্লখিত রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো আইন রচনা প্রসঙ্গে এসেছে তা অনুরূপ বিষয় যা নিম্নোক্ত আয়াতে বিধৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
+++++++++
অর্থাৎ তারা (ইহুদী ও খৃষ্টান) আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসার বিরাগীগণকে তাদের প্রভূরূপে গ্রহণ করেছে’ (সূরা তাসা ৯/৩১)।
আদী বিন হাতিম (রাঃ) যিনি খৃষ্টান ধর্ম থেকে মুসলমান হয়েছিলেন তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে এলাম যখন তিনি সূরা বারা’আত (আত তওবাহ) তেলাওয়াত করছিলেন। তারা (ইহুদী ও খ্রিষ্টান) আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সন্নাসীদের তাদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছে এ আয়াতে তিনি (ছাঃ) পোঁছলে আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমরা কখনো তাদেরকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করিনি। তিনি প্রতু্যত্তরে বললেন, হঁ্যা অবশ্যই তোমরা তা করেছ। আল্লাহ যা তোমাদের জন্য হারাম করেছিলেন তা কি তারা তোমাদের জন্য হালাল করেনি এবং তোমরাও তা হালাল হিসাবে গ্রহণ করনি? এবং আল্লাহ যা তোমাদের জন্য হালাল করেছিলেন তাকি তারা হারাম করেনি এবং তোমরাও তা হারাম হিসাবে গ্রহণ করনি? আমি বললাম হাঁ তাই। তখন তিনি বললেন, তাই হচ্ছে তাদের উপাসনা করা’। =(আহমদ। তিরমিযী একে ছহীহ বলেছেন)।
এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে আল্লামা আলুসী বলেন, ‘অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এখানে প্রভুর অর্থ এ নয় যে, তারা এদেরকে মহাবিশ্বের পালনকর্তা মনে করত, বরং এর অর্থ এই যে, তারা তাদের আদেশ-নিষেধ মান্য করত।’ এখান থেকে স্পষ্টতঃই বোঝা যায় যে, আল্লাহর পাশাপাশি ইহুদী রাব্বী বা খৃষ্টান পাদ্রী এবং এম.পি-দের মত কোন ব্যক্তি যদি মানুষের জন্য আইন রচনা করে সে প্রকৃতপক্ষে তাদের উপর প্রভুত্ত্বের আসনে সমাসীন হয়। আর সুস্পষ্টভাবে কূফর হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট। অতএব এম.পিদের কেউ যদি এ সংসদীয় শিরকের কাজে অংশগ্রহণ করে সন্তুষ্ট থাকে তবে তার কুফর সন্দেহাতীতভাবেই পরিষ্কার। অনুরূপভাবে যে এম.পি দাবী করে যে, সে আসলে এতে সন্তুষ্ট নয় কিন্তু শুধুমাত্র দাওয়াত ও সংস্কারের জন্য পার্লামেন্টে প্রবেশ করেছে সেও কাফির। তার এরূপ বক্তব্য সাধারণ ও অজ্ঞ লোকদেরকে প্রবঞ্চনার উদ্দেশ্যে একটি ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এটা হচ্ছে তার আত্মরক্ষার জন্য একটি ঢালস্বরূপ। তার কর্ম কুফর হওয়ার পশ্চাতে যুক্তি হচ্ছে এই যে, তার পার্লামেন্টে প্রবেশ করা ওদের কার্যকলাপের পক্ষে স্বীকৃতিস্বরূপ হয়ে যায় অর্থাৎ ‘ফায়সালার জন্য মানুষের ইচ্ছার কাছে প্রাথর্ী হওয়া’র বৈধতা দান করা হয় এবং এ সংক্রান্ত নীতিমালা ও যে পদ্ধতির মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে সেই সংসদীয় ব্যবস্থার নীতিমালার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে হয়। এসবই হচ্ছে ফায়ছালার জন্য স্বেচ্ছায় ত্বাগুতের (ভ্রান্ত প্রভূসমূহ) কাছে গমন, যা কোন ব্যক্তিকে কাফিরে পরিণত করে। কারণ আল্লাহ বলেন,
+++++++++++
তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করনা কেন, উহার মীমাংসা তো আল্লাহ্রই নিকট’ (আশ শূরা ৪২/১০)।
অপরপক্ষে গণতন্ত্রের নীতি বলে, ‘তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ কর তার ফয়সালা পার্লামেন্টে গণপ্রতিনিধিদের হাতে অথবা গণভোটে অধিকাংশ জনসাধারণের মতামতের উপর নির্ভরশীল।’ আইনসভার সকল সদস্যকেই এ কুফরী নীতির অনুগত হতে হয় এবং যদি তারা এর প্রতি সামান্যতম বিরোধিতা প্রদর্শন করে তাহ’লে তাদেরকে বিধানুযায়ী বরখাস্ত হতে হবে। অতএব যে-ই আমাদের কাছে কুফরীর ঘোষণা দেবে আমরাও তার কুফরীর বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরব। এই পার্লামেন্টগুলো হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার বাণীসমূহের প্রতি অবিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ তাদের প্রধান কাজই হচ্ছে সেই মহান স্বত্তার প্রদত্ত বিধানের বাইরে আইন প্রণয়ন করা। সুতরাং এসব আইনসভায় যারা অবস্থান নিবে তারা কুফরীতেই নিমজ্জিত।
এমপি-দের আরেকটি কুফরী কাজ সম্পর্কে কিছু লোক সচেতন নয়। আল্লাহর পরিবর্তে নিজেরাই আইন রচনাকারী কর্তৃপক্ষ হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণই তাদের একমাত্র কাজ নয়। বরং সমস্ত আধুনিক, সেকু্যলার (ধর্মহীন) শাসন ব্যবস্থা অনুযায়ী পার্লামেন্টই দেশের সাধারণ রাজনৈতিক বিষয়ে নির্দেশনা দান করে এবং আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের যাবতীয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। সংসদের উপস্থিতিতে সরকার তার কাছেই জবাবদিহী।
অর্থাৎ মানবরচিত আইনের দ্বারা শাসন পরিচালনা এবং আভ্যন্তরীন ও বহিঃরাজনীতিতে, শিক্ষা, সাংবাদমাধ্যম, অর্থনীতি বা অনুরূপ ক্ষেত্রগুলোতে ধর্মহীন সেকু্যলার নীতি অনুসরণের মত যে সমস্ত কুফরী নিয়মিত অনুশীলন করে চলেছে তার জন্য দায়ী মূলতঃ এই এম.পিগণ। যারা অধীনস্ত সরকারকে এসব নীতি বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছে। এক্ষণে সে কুফরী নীতি লংঘন করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে সরকারের কাছে তাদের কৈফিয়ত তলব করার অধিকার রয়েছে। রয়েছে অধিকার তা বাস্তবানের অনুমতি দেওয়ারও।
চারটি বিষয় ইসলামকে বিনষ্ট করে। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করবে সে দৈনন্দিন আদানপ্রদান, হুদুদ (ইসলামী ফৌজদারী আইন) বা অনুরূপ অন্য কোন বিষয়ে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত শরীয়াহ ছাড়া (অন্য কোন আইনে) শাসন পরিচালনা করা অনুমোদনযোগ্য, সে এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হবে। এমনকি প্রকৃতপক্ষে যদি সে এটাকে শরী’আহর চেয়ে উত্তম বলে বিশ্বাস নাও করে। কারণ, এই অনুমোদন করে সে সর্বসম্মত আল্লাহ্র নিষিদ্ধ কাজকে বিধিবদ্ধ করে বৈধতা দান করেছে। আর ব্যাভিচার, মাদকদ্রব্য, সূদ এবং আল্লাহ নির্ধারিত শরীয়াহ পরিত্যাগ করে অন্য আইনে শাসন করার মত অপরিহার্যভাবে জ্ঞাত নিষিদ্ধ জিনিসকে যে সিদ্ধ করবে, মুসলিমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সে কাফির।
প্রসঙ্গক্রমে ‘আরব জাতীয়বাদের সমালোচনা’ নামক শায়খ বিন বাযের একটি প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করা যায়। যেখানে তিনি ‘মানব রচিত আইনের শাসন’ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন, ‘এটা এক বিরাট অনিষ্টকর কর্ম, সুস্পষ্ট কুফরী এবং ধর্মত্যাগের ঘোষণা। জনগণের মধ্যে যারা তাদেরকে (এম.পিদের) ভোট দেয় তারাও অনুরূপ কুফরীতে লিপ্ত। কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়ম অনুসারে বাস্তবে জনগণই এমপিদেরকে সংসদে আল্লাহকে ছাড়াই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রভুত্ত্বের শিরক অনুশীলন করার জন্য তাদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করে। এভাবে ভোট দাতাগণ এম.পিদেরকে শিরকের বাস্তবায়নের অধিকার দান করে এবং ভোট দানের মাধ্যমে আল্লাহর পরিবর্তে তাদেরকেই ‘আইন প্রণয়নকারী প্রভু’র আসনে সমাসীন করে।
আল্লাহ বলেন,
+++++
ফিরিশতাগণকে ও নবীগণকে প্রতিপালক রূপে গ্রহণ করতে সে তোমাদেরকে নির্দেশ দিতে পারে না। তোমাদের মুসলিম হওয়ার পর সেকি তোমাদের কুফরীর নির্দেশ দিবে? (আলে ইমরান ৩/৮০)।
তাই যদি কোন ব্যক্তি ফেরেশতা এবং নবীদেরকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করার কারণে কাফির হয়ে যায় তাহ’লে যারা এম.পিদেরকে প্রভু হিসাবে বরণ করে তাদের ব্যাপারে ফায়সালা কি হবে? যেমন আল্লাহ কলেন,
+++++
তুমি বল (মুহাম্মাদ ছাঃ) হে কিতাবীগণ! আস সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক। যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করি, কোন কিছুতেই তাঁর শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকেও আল্লাহ ব্যতীত রব হিসাবে গ্রহণ না করে। যদি তারা মুখ ফিরাইয়া নেয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা মুসলমান (আলে ইমরান ৩/৬৪)।
ফলে আল্লাহর পাশাপাশি মানুষকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করা হচ্ছে শিরক এবং আল্লাহকে অস্বীকার করার নামান্তর। আর এম.পিদের ভোট দাতাগণ এ কাজটিই করে থাকেন। প্রফেসর সাইয়্যেদ কুতুব (রহঃ) পূর্বোক্ত আয়াত সম্পর্কে বলেন, ‘নিশ্চয়ই পৃথিবীতে সকল ব্যবস্থায়ই মানুষ আল্লাহকে বাদ দিয়ে একে অন্যকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করেছে। চরম স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার মত এটা ঘটেছে সর্বাধিক প্রগতিশীল গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও। নিশ্চয়ই মানুষকে আল্লাহর ইবাদতমূখী করা এবং সমাজ ব্যবস্থাপনা, চিন্তাধারা, শরীয়াহ আইন, মূল্যেবোধ ও নৈতিক আদর্শগত বিষয়ে নীতিমালা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একচ্ছত্র অধিকার সংরক্ষণ রুবুবিয়্যাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু পৃথিবীতে সকল ব্যবস্থায়ই কতিপয় মানুষ এ অধিকারের দাবীদার হয়ে থাকে। তারা অন্যান্যদেরকে তাদের গৃহীত আইন, মানদন্ড, মূল্যবোধ ও ধারণার বশীভূত করে পৃথিবীতে প্রভুত্ব করে। আর তাদেরকে কিছু লোক আল্লাহকে বাদ দিয়ে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করে এবং তাদের উলুহিয়্যাত ও রুবুবিয়াতের দাবীকে অনুমোদন করে। এ কারণে বলা যায় যে, তারা মূলতঃ আল্লাহর পরিবর্তে ওদেরই উপাসনা করে। এমনকি যদি তারা ওদেরকে সরাসরি সেজদা বা রুকু নাও করে, যেহেতু এভাবে উপাসনা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে করা যায় না।
তিনি আরো বলেন, ‘ইসলাম আল্লাহ্র প্রেরিত ধর্ম এবং এ ধর্মের জন্যই প্রেরিত হয়েছেন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে প্রত্যেক নবী-রাসূল। বস্তুতঃই আল্লাহ নবী-রাসূলদেরকে এ ধর্ম নিয়ে পাঠিয়েছেন মানব জাতিকে তাঁর দাসদের (মানুষের) দাসত্ব থেকে মুক্ত করে নিজের দাসত্ব নিয়ে আসার জন্য এবং তাঁর দাসদের নিপীড়ন থেকে মুক্ত করে স্বীয় ন্যায়-বিচারের আওতাধীন করার জন্য।
অতএব যে ব্যক্তি এ দ্বীন থেকে মুখ ফিরাবে সে আল্লাহ্র সাক্ষ্য অনুযায়ী মুসলমান নয়। এ ব্যাপারে ভুল বুঝাবুঝিতে লিপ্ত ব্যক্তিদের ভুল ব্যাখ্যা এবং পথভ্রষ্টদের বিপথে পথ চলা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ্র নিকট একমাত্র মনোনীত জীবনবিধান হ’ল ইসলাম।’
তাই সেকু্যলার পার্লামেন্টগুলো, যেখানে কুফরী আইন প্রণয়ন করা হয়, অনুমোদন দেওয়া হয় এবং প্রকৃত পক্ষে শক্তিপ্রয়োগ করে এগুলোর বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা হয়, তা আজ মুশরিকদের মন্দিরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ; যেখানে তারা তাদের দেবতাদেরকে বসায় এবং পৌত্তলিক ও শিরকী আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। অতএব যে ব্যক্তি এখানে অংশগ্রহণ করে যেমন এম.পিগণ করছে এবং যারা এই এম.পিদের ভোট দানের মাধ্যমে নির্বাচন করে যেমন ভোটারগণ অথবা মানুষের কাছে এ ব্যবস্থাকে সুশোভিত করে তুলে এসব পার্লামেন্টগুলো প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে – সে একজন কাফির।
গণতন্ত্র ও আইনসভা (পার্লামেন্ট) হচ্ছে কাফিরদের এবং তাদের প্রবৃত্তির ধর্ম। সুতরাং এ ধর্মে প্রবেশ করা এবং একে অনুসরণ করে সন্তুষ্ট থাকার অর্থ ইসলামের গণ্ডিমুক্ত হয়ে যাওয়া। আল্লাহ বলেন,
++++++
আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে ইলম আসার পরে তুমি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর তাহ’লে তুমিও একজন যালিম (বাক্বারাহ ২/….)।
অতএব, কাফির এবং মুরতাদদের ন্যায় নিজের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবেন না এবং এসব কুফরীর মন্ত্রণাগৃহের মাধ্যমে শরীয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার আশা প্রদানের মাধ্যমে নিজেকে বিপথগামী করার সুযোগ শয়তানকে দিবেন না। আল্লাহ বলেন, +++++ ‘সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা ছলনা মাত্র’ (নিসা ৪/১২০)।
অনুরূপ জেনে রাখবেন, গণতন্ত্র হচ্ছে আমেরিকার (সাধারণভাবে সকল পশ্চিমা দেশগুলোর) ধর্ম যে আমেরিকা নিজেকে বিশ্বের বুকে গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ মনে করে। মার্কিন কংগ্রেস (পার্লামেন্ট) একটি আইন পাশ করে শতর্ারোপ করেছে যে, যে সব দেশ মার্কিন সাহায্য দেওয়া হবে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে। এটা এ কারণে সে, গণতন্ত্র হচ্ছে আইনসংগত উপায়ে সেসব দেশের অভ্যন্তরীন ব্যাপারে মার্কিনীদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম সহজ পন্থা। আর এটা ঘটে আইনসভার সদস্যদের উপর প্রভাব খাটিয়ে এবং নির্বাচনে সাধারণ মানুষকে টাকার দ্বারা প্রলুব্ধ করে নির্দিষ্ট লোকদের এম.পি হিসাবে বিজয়ী করার মাধ্যমে।
আমেরিকা অনেক আইনসভার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে। যেমন- ১৯৪৭ খৃষ্টাব্দের ইতালীর নির্বাচন। এ বছর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান তার বিখ্যাত নীতি ঘোষণা করেন যা ইতালীতে কমিউনিস্ট পার্টিকে পরাজিত করে খৃষ্টান ডেমোক্রেটিক পার্টিকে বিজয়ী করার জন্য আমেরিকার গোয়েন্দা বাহিনীর ৭০ মিলিয়নেরও অধিক ডলার ব্যয় করাকে বৈধতা দিয়েছিল। অধিকন্তু আমেরিকা সে সময়ে সাধারণ মানুষকে বশ করে ফেলেছিল বলে গর্ববোধ করে। ১৯৭৬ খৃষ্টাব্দে আমেরিকা ইতালীর নির্বাচনে আরেক দফা হস্তক্ষেপ করে। তখন আমেরিকার সেক্রেটারী অব স্টেট হেনরী কিসিঞ্জার ইতালীর নির্বাচনে অবাঞ্চিত হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য তার বিখ্যাত নীতি ঘোষণা করে।
আমেরিকার এই গণতন্ত্র ধর্মটি ইহুদী এবং খিষ্টানদেরও ধর্ম। যাদের ফাঁদে পড়া সম্পর্কে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) আমাদেরকে সতর্ক করেছেন। তিনি (ছাঃ) বলেন, তোমরা নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববতর্ীদের পদাংক অনুসরণ করবে। বিঘত বিঘত এবং একহাত একহাত করে অগ্রসর হবে। এমনকি তারা যদি সরীসৃপের গর্তেও প্রবেশ করে থাকে তাহ’লে তোমরাও তাদেরকে অনুসরণ করবে। তারা (সাহাবীগণ) জিজ্ঞাসা করেন, হে রাসূল (ছাঃ)! আপনি কি ইহুদী এবং খৃষ্টানদের কথা বুঝাচ্ছেন? তিনি বললেন তাদের ছাড়া আর কার কথা হবে?
মূলতঃ মুসলিমদেরকে ধর্মত্যাগী শাসক এবং অন্যান্য কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার অবশ্যকীয় কর্তব্য থেকে ভিন্নমুখী করার জন্য এ গণতন্ত্র একটি কুট প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এভাবে মানবরূপী শয়তানগুলো বলছে, ‘জিহাদ এবং কষ্টের পথ অবলম্বন কেন? যেখানে ভোটের বাঙ্গুলোতেই সমাধান প্রস্তুত রয়েছে? শরী’আহ অনুযায়ী যা তোমাদের উপর কর্তব্য তা হল ভোটের বাঙ্ েগিয়ে একখানা ব্যালট পুরে আসবে।’ আর শায়খ বিন বায ইহার সমর্থনে এরূপ একটি ফতোয়া দিয়েছেন, ‘..কিন্তু এবারে যদি জিততে না-ই পারো তবে পরের বারে তো জিতবে’।
এভাবে ভোটের বাঙ্রে ফলাফলের অপেক্ষায় মানুষ তাদের জীবন কাটাতে থাকবে। নিঃসন্দেহে এ শয়তানী পথে সবচেয়ে সন্তুষ্ট হয় বিভিন্ন প্রকৃতির ত্বাগুতী শাসকদল; যারা ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে কতিপয়কে পার্লামেন্টে প্রবেশের অনুমোদন দেয় কেবলমাত্র মুসলমানদেরকে জিহাদ থেকে ফিরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন, ‘ ইমামত প্রতিষ্ঠিত হয় শক্তিসম্পন্ন লোকদের আনুগত্যের দ্বারা।’ অনুরূপভাবে আমাদের যুগেও শক্তি ব্যতীত কোন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়। অতএব পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইসলামপন্থী হওয়ার দাবীদারগণকে কয়েক মিলিয়ন মানুষের ভোটদানে রোমাঞ্চিত হওয়া ঠিক নয়। নিশ্চিতভাবে এসব লোকদেরকে যদি ইসলামী শাসন জারী করার উদ্দেশ্যে বাহু উত্তোলন করতে এবং জিহাদ পরিচালনা করতে বলা হয় তাহ’লে তারা পলায়ন করবে। সুতরাং কাফির শাসকদের বিরুদ্ধে এসব লোকেরা কোন শক্তি অথবা বলিষ্ঠ সৈন্যদল প্রস্তুত করেছে? শক্তির অধিকারীরাই রাষ্ট্রের অধিকারী হয় আর শক্তি সৃষ্টি হয় লোকবল ও অস্ত্রশস্ত্রের সমন্বয়ে, তারপর অতিরিক্ত সামগ্রীর সাহায্যে। পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফলাফল মিথ্যা এবং প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু্ই নয় যা শরীয়তের যথার্থ প্রমানের ভিত্তিতে হওয়া তো দূরের কথা এমনকি শক্তির উপরও প্রতিষ্ঠিত নয়।
অধিকন্তু পার্লামেন্ট এবং নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি ধোঁকা যা ইসলামের সুযোগগুলো হরণ করে নেয় এবং এটি এমন একটি স্টেশন যা তাগুতের সিংহাসন থেকে ইসলামের এই সুযোগগুলোকে বহু দূরে স্থানান্তর করে দেয়। সকল প্রকার কাফিররাই গণতন্ত্রের প্রতি দাওয়াত দিতে থাকবে যতক্ষণ তা তাদের খায়েশ মিটিয়ে যাবে। কিন্তু কোন একদিন যখন তা তাদের স্বার্থের হানি ঘটাবে যাবে তখন তারাই প্রথমচোটে একে ধ্বংস করবে। এরা হচ্ছে ঐ কাফিরের তুল্য যে নিজের হাতে গড়া মূর্তিকে লেপে যায় দিনের পর দিন, কিন্তু যখন সে ক্ষুধার্ত হয় তখন নিজেই নিজের খোদাকে ভক্ষন করে যার সে উপাসনা করত। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে এর অসংখ্য নজীর বিরাজমান রয়েছে।
শেষ কথা হলো, এম.পিরা তারাই যাদের মানুষের জন্য আইন প্রণয়নের অধিকার রয়েছে এবং বাস্তবার্থে আল্লাহর পরিবর্তে তারাই উপাস্য হয়ে দাড়ায়। আর যারা তাদেরকে ভোট দেয় তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদেরকে প্রভু নিয়োগ করে। সুতরাং এ কাজের দ্বারা উভয় পক্ষই কাফিরে পরিণত হয়। আল্লাহ বলেন, ++++++++ (সূরা আলে ইমরান ৩/৬৪) আয়াত দ্রষ্টব্য)।
সুতরাং আইন সভায় (পার্লামেন্ট) প্রবেশ করা অথবা এর সদস্য হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা অনুমোদনযোগ্য নয়। প্রাথর্ী হয়েই হৌক কিংবা ভোট দিয়েই হৌক নিশ্চয়ই এসব পার্লামেন্টে অংশগ্রহণ কুফরে আকবর। বস্তুতঃ কতিপয় কাফির দাবী করত যে, তারা আল্লাহ্র নিকটবতর্ী হওয়ার নিয়্যতে ও লক্ষ্যে কুফর করত। কিন্তু আল্লাহ তাদের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাদেরকে কাফির ও মিথ্যাবাদী হিসাবেই সাব্যস্ত করেন। কারণ যদি তারা আল্লাহ্র নিকটবতর্ী হওয়ার নিয়ত পোষণ করত তাহ’লে তারা তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর নির্দেশিত পথেই তা করত এবং তাঁর নিষিদ্ধ পথে তা করত না। আল্লাহ বলেন, ++++++++++
অর্থঃ যারা আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করে তারা বলে আমরা তো ইহাদের পূজা এই জন্যই করি যে, ইহারা আমাদেরকে আল্লাহ্র সানি্নধ্যে এনে দিবে। উহারা সে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে আল্লাহ তার ফায়ছালা করে দিবেন। সে মিথ্যাবাদী ও কাফির আল্লাহ তাকে সৎ পথে পরিচালিত করেন না’ (যুমার ৩৯/৩)।
বিন বায নিজেই বলেন, আর প্রকৃতপক্ষে কিছু মুশরিক দাবী করেছিল যে, নবী ও ধার্মিক লোকদের উপাসনা করা এবং আল্লাহর পরিবর্তে মূর্তিগুলোকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করার পিছনে তাদের নিয়্যত ছিল নিজেদেরকে আল্লাহ্র কাছাকাছি নিযে যাওয়া এবং তাদের মধ্যস্থতায় আল্লাহ্র কাছে পৌছানো। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা নিজেই তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাদের যুক্তি খণ্ডন করেন। তিনি বলেন,
+++++++++
অর্থঃ উহারা আল্লাহ ব্যতীত যাহার ইবাদত করে তাহা উহাদের ক্ষতি ও করতে পারে না। উপকারও করতে পারে না। উহারা বলে, এইগুলি আল্লাহ্র নিকট আমাদের সুপারিশকারী। বল তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিবে যাহা তিনি জানেন না? তিনি মহান পবিত্র এবং তাহারা যাহাকে শরীক করে তাহা হইত তিনি উধের্্ব (ইউনুস ১০/১৮)।
অতএব বিষয়টি ঠিক সে ব্যক্তির মত যে পার্লামেন্টে প্রবেশ করে এবং বলে যে, তার নিয়্যত হচ্ছে আল্লাহ্র পথে দাওয়াত দেওয়া। সে একজন মিথ্যাবাদী এবং কাফির যদিও সে শিরক করে থাকে আল্লাহ পথে ও আল্লাহ্র জন্য দাওয়াতের উদ্দেশ্যে। আল্লাহ বলেন,
++++++++
বল (মুহাম্মাদ (ছাঃ)! নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করিয়াছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ এবং অসংগত বিরোধিতা এবং কোন কিছুকে আল্লাহ্র শরীক করা যাহার কোন সনদ তিনি প্রেরণ করেন নাই এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যাহা তোমরা জান না (আ’রাফ ৭/৩৩)।
অতএব মুসলমান হয়ে মুসলিম আক্বীদাহ বুকে ধারণ করে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে প্রেরিত না হওয়া কোন বিধানের পায়রবী করা, তাতে সমর্থন দান ও অংশগ্রহণ করা সর্বতোভাবে অন্যায়। এর ফলে একদিকে তারা (গণতন্ত্রপন্থীরা) সাধারণ মানুষের অনুভূতি ধ্বংস করে। সাথে সাথে জনগণের সাথে তাদের নিজেদের বন্ধুত্ব নিশ্চিত করেছে আর মাদকাসক্ত করেছে তাদের সচেতনতাকে। অতঃপর তারা আল্লাহ্র শরী’আতের ধ্বংস ত্বরান্বিত করেছে নিজেদের উত্থানযাত্রা নিরাপদ রেখেই। ফলে গণতন্ত্রের প্রভুরা নিজেদেরকে নাস্তিক ও অধার্মিক বলে স্বীকৃতি দিতেও কোন পরোয়া করছে না। অন্যদিকে তারা গর্বভরে এ কথার স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, তারা গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রতিনিধি।

মূল লিংক http://www.missionislam.com/knowledge/Democracy.htm
মন্তব্য করুন

About আহমাদ অব্দুল্লাহ

একটি উত্তর দিন