চরম আকার ধারণ করেছে অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার প্রটোকল) ব্যবসা। শুধু আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ধার মোবাইল ফোন অপারেটররাই নয়, খোদ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল আর টেলিটক এখন ভিওআইপির ব্যবসার নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা এই ব্যবসার মূলহোতা। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে চালানো হচ্ছে এই রমরমা ব্যবসা। সিন্ডিকেটের সঙ্গে রয়েছে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী, এমপি, টেলিকম মন্ত্রণালয়, রেগুলেটরি সংস্থা বিটিআরসির বেশ ক’জন শীর্ষ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ইন্ধন। প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা ভাগবাটোয়ারা হচ্ছে সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে। যার কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে হোতারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১০ বছরে এই অবৈধ ভিওআইপির কারণে ১৫শ’ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে এই সিন্ডিকেট। এর মধ্যে শুধু ভুয়া ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে হাতবদল হয়েছে ৫শ’ কোটি টাকার বেশি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ভিওআইপি ক্যারিয়ারদের কাছ থেকে পাওয়া ব্যাংক ড্রাফটগুলো ভাঙাতে গিয়ে দেখা গেছে অধিকাংশ ড্রাফট ভুয়া ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা। হিসাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারগুলোর কাছে বর্তমানে বিটিসিএল’র পাওনা প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা। কিন্তু গত বছরের অক্টোবরের দিকে বিটিসিএল এসব প্রতিষ্ঠানের দেয়া ব্যাংক গ্যারান্টি ভাঙাতে গিয়ে দেখতে পায়, অধিকাংশ ড্রাফটই জাল ও ভুয়া। তাই এসব ব্যাংক ড্রাফটের বিপরীতে আসা প্রায় ২শ’ কোটি টাকা আদায় নিয়ে তোলপাড় শুরু হচ্ছে বিটিসিএলে। জানা গেছে, নিজেদের বাঁচাতে সিন্ডিকেট এখন বিভিন্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা মোকদ্দমা শুরু করেছে। এরকমই একটি ক্যারিয়ার রাজটেক লিমিটেডের ৪৬ কোটি টাকার ভুয়া ব্যাংক ড্রাফটের কারণে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন সোনালী ব্যাংক বাড্ডা শাখার ম্যানেজার মোহাম্মদ আবদুস সালাম। রাজটেক ওই ব্যাংক শাখার নামে একটি ভুয়া গ্যারান্টি জমা দেয়। যে ব্যাংক ড্রাফট তৈরির সঙ্গে ওই ব্যাংক কিছুই জানে না বলে জানিয়েছে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেট ওই ব্যাংকের ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্টদের সিল-সই জাল করে একটি ভুয়া ব্যাংক ড্রাফট তৈরি করে ভিওআইপি ব্যবসার বিল পরিশোধ করতে বিটিসিএল’র কাছে জমা দেয়। বিটিসিএল থেকে নভেম্বর মাসে গ্যারান্টির টাকার জন্য ব্যাংকের কাছে চিঠি লিখলে ব্যাংক জানায়, সেটি ভুয়া। একই সঙ্গে কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই তাৎক্ষণিক ম্যানেজারকে সাময়িক বরখাস্ত করে। এর আগেও বিটিসিএল পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) হোসাইন টেলিকম নামে একটি ক্যারিয়ারের দেয়া ৯ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টির বিষয়ে জানতে ব্যাংকের বাড্ডা শাখায় চিঠি দেয়। গত বছর ৩১ মে এক চিঠিতে ওই ব্যাংক গ্যারান্টিও ভুয়া বলে জানানো হয়। সে সময় কাউকে বহিষ্কার করা হয়নি। কিন্তু রাজটেকের ক্ষেত্রে ব্যাংক শাখার কাছে এরকম ব্যাখ্যা না চেয়েই ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। এ বিষয়ে সাময়িক বরখাস্তকৃত ম্যানেজার মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, ভুয়া এ ব্যাংক গ্যারান্টির সঙ্গে তার বা তার ব্যাংকের শাখার কারও কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। রাজটেক ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে বিটিসিএলের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টির সঙ্গে অনেক রাঘব বোয়াল জড়িত থাকায় তাদের রক্ষা করতে তড়িঘড়ি করে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঠিক একই কারণে রাজটেক ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে ব্যবসা করলেও বিটিসিএল তাদের পাওনা ৪৫ কোটি টাকা আদায়ে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা করেনি। যদিও গত বছরের ১০ নভেম্বর বিটিসিএল রাজটেককে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল, ২৫ নভেম্বরের মধ্যে পাওনা পরিশোধ না করলে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে বিটিসিএল মামলা না করলেও ব্যাংকের প্রধান শাখার জেনারেল ম্যানেজার নওশের রাজটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিবুল বাসার ও বাড্ডা শাখার ম্যানেজারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। বিটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৭ নভেম্বর এ বিষয়ে একটি তালিকা তৈরি করে বিটিসিএল। তালিকায় ৫৪টি ক্যারিয়ারের কাছে বিটিসিএলের বকেয়া পাওনা দেখানো হয়েছে ৪৯৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকারও বেশি। অথচ এই ক্যারিয়ারগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত বিটিসিএলের ব্যাংক গ্যারান্টি ২ কোটি ৫৭ লাখ ৫৯ হাজার ডলারের। যদিও ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির একটি সাব-কমিটি বলছে, এই তালিকা পূর্ণাঙ্গ নয়। আরও অনেক হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এমন অনেক কোম্পানি রয়েছে যাদের ব্যাংক ড্রাফটের চেয়ে পাঁচগুণ বিল বকেয়া পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক গ্যারান্টিবিহীন প্রিপেইড পদ্ধতির ক্যারিয়াগুলোর ক্রেডিট অনেক আগে শেষ হওয়ার পরেও তাদের টেলিফোন কল নিচ্ছে বিটিসিএল। এভাবেও পাওনার পরিমাণ বাড়ছে কয়েকশ’ কোটি টাকা। নিয়মানুসারে প্রতি মাসে বিল আদায় করার ব্যবস্থা রাখা হলেও তিন বছর আগে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এমন কোম্পানির কাছেও শত কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বিটিসিএলের। ২০০৮ সালে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ইংল্যান্ডের টেলি লিংকের কাছে এখনও ৩ লাখ ৪০ হাজার ডলারের বকেয়া রয়েছে। কিন্তু এ টাকা আদায়ে কোন উদ্যোগই নেয়নি বিটিসিএল।
জানা গেছে, সংসদীয় কমিটির গত কয়েকটি বৈঠকে এ নিয়ে কড়া সমালোচনার মুখে পড়ে বিটিসিএল। তার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু ক্যারিয়ারের সংযোগ নতুন করে বিচ্ছিন্ন করে তারা। সব মিলিয়ে বকেয়া আদায় না হওয়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ক্যারিয়ারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২টি। আর সংযোগ বিচ্ছিন্ন এসব ক্যারিয়ারের কাছে বিটিসিএলের পাওনা ১ কোটি ৯৪ লাখ ৮৪ হাজার ডলার। এর মধ্যে ২০০৮ ও ২০০৯ সালে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা অনেকগুলো ক্যারিয়ারও রয়েছে। এদের কাছ থেকে কোনো টাকাই আদায় করছে না বিটিসিএল। ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে ডিজিটেক নামে একটি ক্যারিয়ার অনেক আগে থেকে ব্যবসা করে আসছিল। অথচ তাদের কাছেই বিটিসিএলের ১ কোটি ৫ লাখ ডলার বকেয়া রয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, সরকারি কোম্পানির সঙ্গে প্রতারণা করা ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বিটিসিএল এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। জানা গেছে, ক্যারিয়ারগুলোর কাছে বিটিসিএলের ২২টি এসটিএম-১ এবং ৩৪৭টি ই-১ এর সংযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এমন ক্যারিয়ারের কাছেও এখনও তাদের এসটিএম-১ এবং অনেক ই-১ রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্রঃ যুগান্তর




0 মন্তব্য