স্মার্টকার্ড নিয়ে ইসির অসন্তোষ

স্মার্টকার্ড নিয়ে ইসির অসন্তোষ

মাহবুব মাসুম: প্রযুক্তিনির্ভর ইলেকট্রনিক কার্ড (স্মার্টকার্ড) নাগরিকদের হাতে পৌঁছতে কয়েক দফা সময় পেছানোয় জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনু বিভাগের ওপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সোমবার ইসির সম্মেলন কক্ষে কমিশনার এবং এ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি সভায় সংশ্লিষ্ট কাজের অগ্রগতি দেখে হতাশা থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেন কমিশনাররা। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ ও ১৪ এপ্রিল এ কার্ড বিতরণের কথা থাকলেও এখনও কার্ড তৈরির কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে বারবার বিতরণের তারিখ পেছানোয় ইসির ইমেজ নষ্ট হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সোমবার নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, এ প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতি দেখে আমি হতাশ। এনআইডি কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে আমার মনে হয়েছে, তারা কাজের চেয়ে কথা বেশি বলেন। এখনও পর্যন্ত স্মার্টকার্ড প্রস্তুত করার মেশিন বসাতে পারেননি। অথচ তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলতে শোনা গেছে, রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো দিনে ভোটার নাগরিকদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্টকার্ড তুলে দেয়া হবে। অথচ আজকের (সোমবার) বৈঠকে তাদের (এনআইডি) এ সংক্রান্ত কাজের উপস্থাপনা দেখে মনে হয়েছে, সহসাই স্মার্টকার্ডের বিতরণ সম্ভব নয়।
ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন অনুযায়ী ১৮ বছরে পদার্পণকারীদের পরিচয়পত্র দেয়া হয়। এ পরিচয়পত্রগুলো সাধারণ কাগজে লেমিনেটেড করা। এতে কিছু ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি এবং বারকোডেও কিছু তথ্য থাকে। এরপরও কার্ডটির নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে ছিল কমিশন। এমনকি অসাধু কিছু চক্র নকল পরিচয়পত্র তৈরি করে জালিয়াতির ঘটনা ঘটাচ্ছিল। নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভুয়া পরিচয়পত্র প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশন ভোটার নাগরিকদের ইউনিক নম্বর সংবলিত উন্নতমানের ‘স্মার্টকার্ড’ দেয়ার উদ্যোগ নেয়। বিশ্বব্যাংকের আইডিইএ প্রকল্পের আওতায় বিদেশ থেকে পরিচয়পত্রের উপকরণ আমদানি করে দেশে মুদ্রণের সিদ্ধান্ত হয়। স্মার্টকার্ড প্রস্তুত ও বিতরণের জন্য ফরাসি কোম্পানি ওবারথু টেকনোলজির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের এ দিনে প্রতীক হিসেবে কিছু ভোটারকে স্মার্টকার্ড দেয়ার ঘোষণা দেয় এনআইডি কর্তৃপক্ষ। নানা জটিলতার বিষয় সামনে এনে ওই সময়ের পরিবর্তে  তারা ২৬ মার্চ অর্থাৎ স্বাধীনতা দিবসে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এ উদ্যোগটিতে ব্যর্থ হলেও ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ বাঙালির চিরায়ত উৎসব বর্ষবরণে (পহেলা বৈশাখ) কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েও তা সফল হয়নি। ওই সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রকল্প পরিচালক ব্রি. জে. সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দীন বলেছিলেন, কৃষক থেকে শুরু করে সবপর্যায়ের ভোটার নাগরিকদের স্মার্টকার্ড দেয়া হবে। রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো দিনে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কমিশন এগুলো বিতরণ করতে চায়। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বরের পর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে এগুলো বিতরণের সিদ্ধান্ত ছিল। এ সময়েও বিতরণ করা যাচ্ছে না। পহেলা বৈশাখে প্রতীকী হিসেবে প্রথম ধাপে ১০ হাজার ভোটারকে এ কার্ড দেয়া হবে।
এর আগে ১৪ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, আগামী স্বাধীনতা দিবসে ভোটারদের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। এদিনে সবার হাতে একসঙ্গে এ কার্ড তুলে দিতে না পারলেও প্রথম পর্যায়ে সীমিত পরিসরে স্মার্টকার্ড বিতরণ শুরু করা হবে।
কমিশন সচিব এবং প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্যের পর স্মার্টকার্ড বিতরণ বিষয়ে আর কোনো আলোচনা ছিল না। হঠাৎ করে কমিশন উদ্যোগী হয়ে স্মার্টকার্ডের অগ্রগতি বিষয়ে প্রকৃত চিত্র জানতে কমিশন বৈঠক আহ্বান করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার ইসির সম্মেলন কক্ষে এনআইডি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কমিশনের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে দেশের বিদ্যমান ৯ কোটি ৬২ লাখ ভোটারের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দেয়ার মতো আশাজাগানিয়া কোনো অগ্রগতি কমিশনকে জানাতে পারেননি এনআইডি সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে তাদের ওপরে অসন্তোষ প্রকাশ করেন কমিশনাররা।
প্রসঙ্গত, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর ইনহ্যান্সি একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১১ সালের জুলাইয়ে। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৩৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আগামী বছরের জুনের মধ্যে এ প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে।
স্মার্টকার্ডে থাকছে ২৫ সেবা : সরকারি বিভিন্ন সেবা, চাকরির জন্য আবেদন, ভোটার শনাক্তকরণ, ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট তৈরি, ই-গভর্নেন্স ও ই-পাসপোর্ট সেবাসহ মোট ২৫টি সেবা প্রাথমিকভাবে পাওয়া যাবে। পর্যায়ক্রমে সেবার পরিধি আরও বাড়তে পারে। এছাড়া স্মার্টকার্ডটি অনলাইনে ও অফলাইনে দুইভাবেই ভেরিফিকেশন করা যাবে। এতে নাগরিকের সব তথ্য সংবলিত মাইক্রোচিপস থাকবে। উল্লেখ্য, বিদ্যমান ভোটার তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে ভোটার ৯ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫২ জন।
সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ

About Sohel Rana

একটি উত্তর দিন