স্বাধীনতা দিবস থেকে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ

স্বাধীনতা দিবস থেকে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ

smart cardএবারের স্বাধীনতা দিবস থেকেই পর্যায়ক্রমে এ দেশের নাগরিকরা পেতে যাচ্ছেন পেপার লেমিনেটেড কার্ডের বদলে অত্যাধুনিক জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্ট এনআইডি কার্ড। শতভাগ নিরাপত্তার এই কার্ড প্রস্তুত ও বিতরণে খরচ হচ্ছে ৭৯৬ কোটি ২৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। ফ্রান্সের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১৪ জানুয়ারি এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আগামী বছরের জুনের মধ্যে মোট ৯ কোটি স্মার্ট এনআইডি কার্ড প্রস্তুত ও বিতরণ সম্পন্ন করবে।
বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালের ২১ জুলাই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহান্সড অ্যাকসেস টু সার্ভিস’ (আইডিয়া) প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে। এ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে এক হাজার ৩৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়া হচ্ছে এক হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে গত রোববার জানানো হয়, স্মার্ট এনআইডি কার্ডে তিনটি স্তরে ২৫টির মতো নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকবে। প্রথম বার বিনা মূল্যে দেওয়া হবে এই কার্ড। তবে পরবর্তী সময়ে সংশোধন করতে বা হারিয়ে গেলে নতুন কার্ড পেতে ২০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ফি দিতে হবে। ১০ বছর পর পর প্রতিটি কার্ড ১০০ টাকা ফি দিয়ে নবায়ন করতে হবে। এ কারণে এটি প্রস্তুতের আগেই যাঁদের পরিচয়পত্রে ভুল তথ্য রয়েছে তাঁদের অনলাইনে তা সংশোধনের জন্য সুযোগ দেওয়া হবে। এ বিষয়ে নিয়মাবলি শিগগির বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দিন এসব তথ্য জানান। সচিব বলেন, এখন যে পরিচয়পত্র ব্যবহার হচ্ছে সেটি জাল করার প্রবণতা দেখা গেছে। কিন্তু স্মার্ট কার্ডের ক্ষেত্রে সেটি সম্ভব হবে না। স্মার্ট কার্ডের মধ্যে যে মাইক্রোচিপস দেওয়া হবে তার মধ্যে একজন নাগরিকের সব তথ্য থাকবে।
ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম আরো বলেন, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থা চালু করা, অধিকতর দক্ষ ও স্বচ্ছ সেবা প্রদানে কাজ করা। এ ছাড়া অধিকতর নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য আটটি ইন্টারন্যাশনাল সার্টিফিকেশন ও স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করা হয়েছে। সচিব আরো বলেন, সরকারি বিভিন্ন সেবা, চাকরির জন্য আবেদন, ভোটার শনাক্তকরণ, ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট তৈরি, ই-গভর্নেন্স ও ই-পাসপোর্ট সেবাসহ মোট ২৫টি সেবা প্রাথমিকভাবে পাওয়া যাবে এই স্মার্ট এনআইডি কাডের্র মাধ্যমে। তবে এ সেবার পরিধি আরো বাড়তে পারে। এ ছাড়া স্মার্ট কার্ডটি অনলাইনে ও অফ লাইনে দুই ভাবেই ভেরিফিকেশন করা যাবে। এতে নাগরিকের সব তথ্যসংবলিত মাইক্রোচিপস থাকবে। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব নাগরিককে কার্ড না দেওয়া পর্যন্ত এটিকে বাধ্যতামূলক করা যাবে না বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক বলেন, আগামী স্বাধীনতা দিবস অর্থাৎ ২৬ মার্চ থেকে পর্যায়ক্রমে নাগরিকদের হাতে স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। এ কারণে বিদ্যমান ভোটারদের শিগগিরই অনলাইনে ভোটারদের তথ্য সংশোধনের সুযোগ দিতে যাচ্ছে ইসি। সোমবার (আজ) কমিশন বৈঠকে বিষয়টি অনুমোদন হলেই অনলাইনে সংশোধনের আবেদন করা যাবে। ফলে সংশোধনের জন্য কাউকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। তাদের আবেদনের সময় এক সময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে সব কার্ড বিতরণ শেষ করা হবে।
সুলতানুজ্জামান বলেন, উপজেলা পর্যায়ে সার্ভার স্টেশনের জন্য ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কের (ভিপিএন) কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সার্ভার স্টেশনগুলোর সরঞ্জাম কেনা শেষ হয়েছে। কমিশনের কেন্দ্রীয় সার্ভার স্টেশনের সঙ্গে উপজেলায় স্থাপিত সার্ভার স্টেশনগুলোর সংযোগ স্থাপন করা গেলে সহজেই নাগরিকরা ভোটার হতে পারবে। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন ইসির অতিরিক্ত সচিব মুখলেসুর রহমান ও জনসংযোগ পরিচালক এস এম আসাদুজ্জামান।
কেমন হবে এই উন্নত জাতীয় পরিচয়পত্র : সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এর সামনের দিকে থাকবে বাংলাদেশ সরকারের লোগো। উপরিভাগে থাকবে জাতীয় ফুল শাপলা, একটি জলছাপ ও ঘোস্ট ইমেজ। পটভূমি হিসেবে থাকবে বাংলাদেশের পতাকা। হলোগ্রাম ও সিএলআইয়ে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য দৃশ্যমান থাকবে এবং বায়োমেট্রিক্স তথ্যসহ বাকি সব তথ্য মেমরি চিপে সংযোজিত থাকবে।
জাতীয় পরিচয়পত্র নাগরিকদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর যাচাই সেবা কার্যকর করা হলে ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নাগরিক সুবিধা, যেমন- বয়স্ক ভাতা, ভর্তুকি, সহায়তা, ঋণ (বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকদের)- এসব সঠিক টার্গেটে পৌঁছানো সহজ হবে। জমিজমাসংক্রান্ত মামলা হ্রাস ও এ ক্ষেত্রে জালিয়াতি প্রতিরোধ সহজ হবে। এ ছাড়া এর ব্যবহার সুশাসন ও ই-গভর্নেন্সকে ত্বরান্বিত করবে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচিগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সহজতর হবে। বিভিন্ন ধরনের ই-সেবা বাস্তবায়নের দ্বার উন্মুক্ত হবে এবং সেবা কার্যক্রম ট্র্যাকিং করাকে সহজসাধ্য করে তুলবে। দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বাল্যবিবাহ রোধে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। পাবলিক ও প্রাইভেট সেবার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।
চাহিদা : ইতিমধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পাসপোর্ট অধিদপ্তর এই পরিচয়পত্র যাচাই সেবা গ্রহণ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারের এ-টুওয়ান প্রকল্প, সমাজসেবা অধিদপ্তর, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিদেশি মিশন- তাদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকদের শনাক্ত করার জন্য এই পরিচয়পত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেছে। বিভিন্ন টেলকো অপারেটরসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই পরিচয়পত্রের চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ছে।

About Sohel Rana

একটি উত্তর দিন