সামাজিক নেটওয়ার্কের নূতন অধ্যায়ের সূচনা – সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্কিং

সামাজিক নেটওয়ার্কের নূতন অধ্যায়ের সূচনা – সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্কিং

কী এই সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ক ?

বিখ্যাত ওয়্যার্ড (Wired) ম্যাগাজিনের এডিটর ডেভিড রাওয়ান সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ককে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঠিক যেভাবে শুরু করেছেন, “ আমি আমার ইনবক্সে প্রায় ত্রিশোর্ধ এক অবার্ন (Auburn – Reddish brown) চুলের অধিকারিণী আমেরিকান মহিলার ছবি-সমেত যে মেসেজটি পেলাম সেটি হল- আমার নাম অ্যালিসন। আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করছি কারণ আমার ডিএনএ প্রোফাইলে ষষ্ঠ সেগমেন্ট তোমার সাথে .৬২% মিলে গিয়েছে এবং আমরা দূর সম্পর্কে কাজিন হতে পারি। ” – এরকম একটি মেসেজ পেলে আমরা যেকেউ অবাক হব বা আমরা নিজেরা এরকম একটি মেসেজ দিয়ে অন্য কাউকে অবাক করে দিতে পারি। হ্যাঁ, সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ক এ অবাক ব্যাপারটিই ঘটাতে যাচ্ছে।

ডেভিড রাওয়ানের বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্কিং কী জিনিস। ফেসবুক বা এজাতীয় সামাজিক নেটওয়ার্কগুলির মাধ্যমে নূতন বন্ধু তৈরি করা যায়, আবার অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোন বন্ধু বা স্কুল জীবনের কোন বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যায়। পরিচিত আত্মীয়-পরিজনকেও নিজের নেটওয়ার্কে আনা যায়। কিন্তু সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ক আপনার অনেক হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়কেও খুঁজে বের করবে।

আমাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, দাদা বা নানার বাবার নাম তাহলে আমরা অনেকেই বলতে পারব না। যদি আরেকটু কঠিন করে জিজ্ঞেস করা হয়, দাদা বা নানার বাবার বাবার নাম কী? তাহলে ক’জন সাথে সাথে বুকে হাত দিয়ে সঠিক নামটি বলতে পারবেন – সন্দেহ আছে। আর দাদা বা নানার বাবা অর্থাৎ প্রপিতামহ বা প্রমাতামহের ভাই-বোনের ঘরের ছেলেমেয়েদের তো চিনিই না। কিন্তু সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ক সেটিই খুঁজে বের করবে। আপনি হয়ে যেতে পারেন বিখ্যাত কোন লেখক/বিজ্ঞানী/সেলিব্রেটির আত্মীয়। হ্যাঁ , সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ক এমনই একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করছে বা করবে।
ডিএনএ (Deoxyribonucleic acid – DNA)
সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ব্যাপারটি আমরা ইতোমধ্যে জানি। কিন্তু কী এই ডিএনএ (DNA)- যা নাকি এতটাই শক্তিশালী। ডিএনএ কীওয়ার্ড দিয়ে গুগল সার্চ দিলে এ সম্পর্কে প্রচুর আর্টিক্যাল পাওয়া যাবে।

আমাদের এই মানবদেহ ট্রিলিয়ন পরিমাণ কোষ (cell) দিয়ে তৈরি। বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের দেহে প্রায় ৫০ ট্রিলিয়ন কোষ আছে।এই কোষগুলি বিভিন্ন রকমের এবং এদের বিভিন্ন ধরণের কার্যকলাপ আছে। একটু মজা করে বলা যায়, আমাদের যে চমৎকার হাসি, তা পেশীকোষের (muscle cell) কারণে, আবার আমাদের ব্রেইন সেল (brain cell) আমাদের মধ্যে হিউমার-এর জন্য দায়ী, হোয়াইট ব্লাড সেল (WBC) যুদ্ধ ঘোষণা করে আমাদের দেহে ঢুকে পড়া ভাইরাসের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ এই সেল-ই হচ্ছে প্রতিটি জীব পদার্থের (living things) বিল্ডিং ব্লকস। প্রতিটি সেল-এর অভ্যন্তরে আছে একটি করে নিউক্লিয়াস। এই নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরেই থাকে বেশির ভাগ ডিএনএ, আবার কিছু পরিমাণ ডিএনএ থাকতে পারে কোষের অভ্যন্তরে কিন্তু নিউক্লিয়াসের বাইরে মাইট্রোকন্ড্রিয়াতে।

ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (DNA) এক প্রকারের নিউক্লিক এসিডের অণু যেখানে সমস্ত জেনেটিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। ওয়াটসন এবং ক্রিক ১৯৫৩ সালে প্রথমে ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স (Double helix) প্যাটার্ন দেখান, যেখানে বিপরীত দিকে চলমান দুটি লম্বা স্ট্র্যান্ড (Strand) অনেকটা সুতার মত একটি আরেকটিকে পেঁচিয়ে রাখে। স্ট্র্যান্ডদুটি সমান্তরাল নয় (runs in opposite direction)। এরা দেখতে অনেকটা প্যাঁচানো মই কিংবা ঘূর্ণায়মান সিঁড়ির মত। স্ট্র্যান্ডদুটি হাইড্রোজেন বন্ডের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত থাকে আর চার প্রকারের বেস-এর মধ্যে তৈরি হয় এই হাইড্রোজেন বন্ড । বেসগুলি হচ্ছে এডেনিন (অ), থাইমিন (ঞ) , গুয়ানিন (এ), ও সাইটোসিন (ঈ)।

জেনে অবাক হতে হয় যে, আমাদের মানবদেহের প্রতিটি ডিপ্লয়েড কোষে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডিএনএ বেসপেয়ার ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের মধ্যে প্যাকেটাইজড অবস্থায় থাকে। প্রতিটি বেসপেয়ারের দৈর্ঘ্য হয় ০.৩৪ ন্যানোমিটার এবং সে অনুযায়ী প্রতিটি কোষে প্রায় ২ মিটার দৈর্ঘের ডিএনএ অণু থাকে।এখন আমাদের দেহে যদি ৫০ ট্রিলিয়ন কোষ থাকে, তাহলে আমরা সবাই একেকজন ১০০ ট্রিলিয়ন মিটার দৈর্ঘ্যের ডিএনএ বহন করছি। আবার আমাদের দেহের প্রতিটি কোষে ডিএনএ-র পুরোটাই কিন্তু মানব জিন  নয়। ডিএনএ-র ২%-এর চেয়েও কম কাজ করে মানব জিন হিসেবে এবং এই জিন দীর্ঘ ডিএনএ অণুতে ছড়ানো অবস্থায় থাকে।

বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের মানবদেহের প্রতিটি কোষে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার জিন বিদ্যমান ও প্রতিটি জিন-এ গড়ে ৩০০০ বেসপেয়ার বিদ্যমান। আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে আমাদের পিতা-মাতা, পিতামহ-মাতামহ, প্রপিতামহ-প্রমাতামহের জিন বহন করছি আর এই জিনের মাধ্যমেই আমরা বংশানুক্রমে কোঁকড়ানো কিংবা সোজা চুল , কালো বা ফর্সা গায়ের রঙ কিংবা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পাই। কিভাবে আমরা এই জিন বহন করছি? আমরা সাধারণত: ২৩ জোড়া অর্থাৎ ৪৬ টি ক্রোমোজমের ২৩ টি পাই আমাদের মায়ের কাছ থেকে আর বাকী ২৩ টি পাই আমাদের পিতার কাছ থেকে।এই ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের ২২ জোড়াকে বলা হয় অটোজমস এবং এরা পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের মধ্যে একই প্রকারের হয়ে থাকে।২৩তম জোড়াটি সাধারণত পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে আলাদা হয় কারণ এরাই আমাদের লিঙ্গ নির্ধারণ করে এবং এ জন্যই এই ২৩-তম জোড়াকে বলা হয় সেক্স ক্রোমোজোম। যেহেতু জিন ডিএনএর-ই একটি অংশ এবং ৬ বিলিয়ন ডিএনএ বেসপেয়ার ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের মধ্যে সন্নিবেশিত অবস্থায় থাকে, তাই আমরা আমাদের পিতা-মাতার কাছ থেকে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম প্রাপ্তির মাধ্যমে পিতা-মাতা বা পূর্বপুরুষের জিন বহন করছি।আগেই বলেছিলাম চার প্রকারের বেস-এর মধ্যেই সংরক্ষিত থাকে জেনেটিক তথ্য।। ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম যখন আমাদের মধ্যে কপি হয় তখন মাঝে-মাঝেই বেস পেয়ার পরিবর্তন, সংযুক্ত বা বাদ পড়ে যেতে পারে। বেস পেয়ারের এই ভ্যারিয়েশনকে বলা হয় স্নিপস ) ।

আর এভাবেই আমরা আমাদের বাবা-মায়ের ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম পেলেও আমরা দেখতে হুবহু তাদের মত হই না বা ভাই-বোন নিজেরা দেখতে হুবহু একে অন্যের মত হই না।
যেমন বেসপেয়ার পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে এভাবে
A A T C G T থেকে A A T G G T কিংবা A A T C G T থেকে A A C C G T
এথেকে বলা যেতে পারে আমরা একই পূর্বপুরুষের বৈশিষ্ট্য বহন করছি কি না?

আবার, আমাদের এই ডিএনএ-রই একটি সেগমেন্ট – জেনেটিক মার্কার ) যা দিয়ে বলা যেতে পারে দুজন মানুষ কমন উত্তরাধিকারেরজিন বহন করছে কিনা।

উপরের টেবিলটিতে দেখা যাচ্ছে XXX এর সাথে YYY-এর ৯ টি মার্কারের মিল আছে কিন্তু ৩ টি মার্কার ভিন্ন।
এভাবেই হিউম্যান জিনোম ডিএনএ সিকোয়েন্সের মাধ্যমে বলে দিতে পারছে দুটি মানুষ কীভাবে একই পূর্বপুরুষের বৈশিষ্ট্য বহন করছে।

ডিএনএ সিকোয়েন্স আরো জটিল । শুধু একটু ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হল।

সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ক গঠনে যারা এগিয়ে আছে
Ancestry.com I GeneTree.com অনেকদিন আগে থেকেই শুরু করেছে ডিএনএ দিয়ে পূর্বপুরুষ খোঁজার কাজ। একবার আপনার নাম, ঠিকানা , জন্মতারিখ, আর ডিএনএ তাদের সিস্টেমে দিয়ে দিতে পারলেই শুরু করতে পারেন ডিএনএ ম্যাচ-মেকিং গেইম। এনসেস্ট্রি-তে আপনি ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করতে পারেন।

এখানে ডিএনএ টেস্ট করানোর পর টেস্ট রেজাল্ট দিয়ে গুগল ম্যাপে খুঁজে বের করা যাবে – বিশ্বের কোথায় আছে আপনার জেনেটিক রিলেটিভস, কোথায় আছে আপনার সেকেন্ড বা থার্ড কাজিন। খরচও খুব একটা বেশি নয়, মাত্র ১৪৯ ডলার দিয়েই শুরু করতে পারেন আপনার জেনেটিক রিলেটিভ খোঁজার কাজটি। তারা তিন ধরণের টেস্ট করছে।

1. Paternal Lineage DNA test – $149-$179, 2. Maternal Lineage DNA Test – $179, 3. Paternal and Maternal Lineage DNA test – $328-$358.

Genetree.com আরেকটি ওয়েব সাইট যারা সারা বিশ্বে ডিএনএ ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফ্যামিলি ট্রি তৈরি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠাতা James LeVoy Sorensonএর Sorenson Molecular Genealogy Foundation (SMGF) ইতোমধ্যে প্রায় ১০০,০০০-এরও বেশি ডিএনএ স্যাম্পল-এর ডাটাবেজ তৈরি করে ফেলেছে।এরাও Paterenal I Maternal Lineage DNA testing করছে।

গুগলও পিছিয়ে নেই। এক্ষেত্রে অবশ্য গুগল নয়, গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রায়ানের স্ত্রী অহহ ডড়লপরপশর প্রতিষ্ঠা করেছেন ২৩ধহফসব.পড়স। ২৩ধহফসব শুধুমাত্র আপনার জেনেটিক রিলেটিভসকেই খুঁজে বের করবে না, এটা চেষ্টা করবে বলতে আপনি কেন বাদামী চুল কিংবা যধুবষ বুবং-এর অধিকারী কিংবা আপনার কোনরকম স্কিন ক্যান্সার না পারকিনসনস-এ ভোগার সম্ভাবনা আছে কিনা? এদের মাধ্যমেও আপনাকে ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করতে পারবেন কিংবা সারা বিশ্ব থেকে আপনার জেনেটিক রিলেটিভসদের খুঁজে বের করে সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারবেন।

সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ক সম্পর্কে Sorenson Molecular Genealogy Foundation এর Scott Woodward বলেন, “ÒPeople just really like the idea that they are connectedÓ”। যুদ্ধ, হানাহানি, বৈষম্যের এই সময়ে সোশ্যাল ডিএনএ নেটওয়ার্ক সারা বিশ্বকে একটি আত্মীয়তার বন্ধনে যুক্ত করতে চাইছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই কেবল পারে সভ্যতাকে আরো এক ধাপ সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কখনোই খারাপ নয়, এটা খারাপ কেবলমাত্র তখনই হয়, যখন এটাকে কিছুসংখ্যক ব্যক্তি খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে।

About blogger - ব্লগার

একটি উত্তর দিন