বিমান যেভাবে বাতাসে ভাসে ।

বিমান যেভাবে বাতাসে ভাসে ।

পাখির মত উড়তে পারার স্বপ্ন মানুষের সেই আদিকাল থেকে । আর তাই একের পর এক চেষ্টার ফলস্রুতিতে মানুষ ঠিকই তার সেই বাতাসে ভেসে থাকার সপ্ন বাস্তবে পূরণ করে । আর এই ভেসে থাকতে পারার বাস্তব রুপ হল মানব পাখি বিমান । বিমানে ভ্রমন করতে ইচ্ছুক নয় এমন মানুষ খুজে পাওয়া সত্যি কঠিন হবে । কিন্ত মজার বিষয় হল আমাদের মাঝে খুব কম লোকই খুজে পাওয়া যাবে যে জানে বিমান কি করে বাতাসে ভেসে থাকে । যারা জানেন না কিন্তু জানতে আগ্রহি তাদের জন্য আমার আজকের এই ছোট্ট প্রয়াস ।

বিমান বাতাসে কি করে ভেসে থাকে তা নিয়ে অনেক মতবাদ থাকলেও সবচেয়ে প্রচলিত হচ্ছে – বাতাস যত দ্রুত প্রবাহিত হয় তত কম চাপ সৃষ্টি করে। বিপরীত ক্রমে অপেক্ষাকৃত ধীর গতিতে প্রবাহিত বাতাস উইং এর নীচের তলে দ্রুত গতিতে প্রবাহিত বাতাসের চেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করে। আর এই বেশি চাপই উপরের দিকে ক্রিয়াশীল একটি বল (Lift) সৃষ্টি করে, যেটি বিমানটিকে উপরের দিকে ঠেলে এবং মাধ্যাকর্ষণজনিত নিম্নমুখী আকর্ষণ বলের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে। এই তথ্যটির অবতারণা করেন অষ্টাদশ শতাব্দীর সুইশ গণিতবিদ ড্যানিয়েল বার্নোলি আর তার নামানুসারেই তথ্যটির নামকরণ করা হয়েছে “Bernoulli’s Principle”। তথ্যটি পুরোপুরি সঠিক হলেও উইং এর উপরের দিকের বাতাস কেন নীচের তলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত দ্রুত প্রবাহিত হয় তার ব্যাখ্যা দিতে পারে না। আর এই অপূর্ণতাই আরও দ্বিধার সৃষ্টি করেছে।

 

বিমান যেভাবে বাতাসে ভাসে ।

বিমান যেভাবে বাতাসে ভাসে ।

ম্যাকিন্টোশ কম্পিউটারের জনকদের একজন, জ্যাফ রাস্কিন মিডল স্কুলে থাকার সময় তার ক্লাসের বিজ্ঞানের শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “Lift যদি উইং এর আকার অথবা এটি কী অবস্থায় আছে কিংবা কোন দিকে মুখ করে আছে তার উপর নির্ভর করে তাহলে উইং এর সামনের অংশ নীচু করলে বিমানটি নীচের দিকে ঠেলা অনুভব না করে, মাটিতে আছড়ে না পড়ে উড়তে থাকে কী করে? আর আমরা যে কাগজের বিমান বানাই সেটার দুটো উইং’এর আকারই তো সমান, মসৃণ এবং মোটেই উপর-নীচ মুখ করে দেয়ার উপর নেই; তাহলে সেটি উড়ে কী করে?” শিক্ষক প্রথমেই তাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে উইং’এর সামনের অংশ নীচু করলে বিমান কখনই উড়তে পারে না। কিন্তু রাস্কিন শিক্ষকের ব্যাখ্যা অগ্রাহ্য করে বললেন তিনি ব্যাপারটা নিজের চোখে দেখেছেন। শিক্ষক দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলেন কাগজের বিমান পুরোপুরি ভিন্ন বৈজ্ঞানিক সূত্রের উপর নির্ভর করে উড়ে। রাস্কিন বুঝতে পারলেন ভদ্রলোক পুরোপুরি ভুল, অযৌক্তিক এবং অসত্য ব্যখ্যা দিচ্ছেন এবং এর প্রমাণও তার কাছে ছিল। পরদিন রাস্কিন ক্লাসে একটি কাঠের তৈরি মডেল বিমান (Balsa-wood model airplane) নিয়ে আসলেন এবং দেখালেন যে যখন বিমানটির উইং নীচের দিকে ঘুরানো থাকে কেবল তখনই সেটি উড়ে। হেরে গিয়ে শিক্ষক অপমানিত বোধ করলেন এবং রাস্কিনকে প্রিন্সিপালের রুমে প্রেরণ করলেন। প্রিন্সিপাল তাকে আচার-আচরণে আরও সংযত এবং ভদ্র হবার নির্দেশ দিলেন।

 

বিমান যেভাবে বাতাসে ভাসে ।

বিমান যেভাবে বাতাসে ভাসে ।

বহুদিন পর ১৯৯৪ সালে রাস্কিন উইং সংক্রান্ত এই সমস্যা এবং উড়ন্ত বিমানের ভেতর একটি বলের কোণ সৃষ্টি করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার কারণ ব্যাখ্যা করে ‘Quantum Magazine’এ একটি প্রবন্ধ লিখেন। সেটিতে তিনি বলেন বার্নোলি’র তথ্যটি নির্ভুল কিন্তু শিশুসুলভ। জনাব রাস্কিন এবং অন্যান্যরা বুঝতে পারেন স্যার আইজ্যাক নিউটনের গতিসূত্রগুলো ব্যাপারটিকে বার্নোলি’র তথ্যের চেয়ে অধিকতর সহজে ব্যাখ্যা করতে পারে। রাস্কিন প্রবন্ধে আরও বলেন, “উইং এমন একটি বস্তু যা বাতাসকে নীচের দিকে ঠেলতে পারে।” আর নিউটনের তৃতীয় সূত্র (প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে) থেকে বলা যায় উইং বাতাসকে নীচের দিকে ঠেলতে যে নিম্নগামী বল প্রয়োগ করে সেটি একটি সমান উপরিগামী বল সৃষ্টি করে, যেটি Lift সৃষ্টি করে এবং বিমানটিকে ভাসিয়ে রাখে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো কতটুকু বাতাস স্থানাতরিত হবে তা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে বাতাসে উড়ার সময় উইং- এ উৎপন্ন কোণের উপর, মোটেই উইং এর আকারের উপর নয়। উইং- এ উৎপন্ন কোণটি ‘Angle of attack’ নামে পরিচিত। Angle of attack বাড়িয়েই পর্যাপ্ত Lift সৃষ্টি করে বিমান বাতাসে ভাসে।

উইং কী করে বাতাসকে নীচের দিকে ঠেলে? এই প্রশ্নের উত্তরে যারা বলবে বাতাসের অণুগুলো উইং এর গায়ে ধাক্কা খেয়ে নীচের দিকে চলে যায় তারা পুরোপুরি ভুল করবে। আসল ব্যাপার হলো বায়ু চাপ এবং বায়ুকণার আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বল বাতাসকে উইং’এর দিকে ঠেলে (একে Coanda Effect বলে) আর তারপর উইং এর Angle of attack এর কারণে বিপুল পরিমাণ বাতাস নীচের দিকে সরে আসতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ উড়ন্ত অবস্থায় কোনো কারণে উইং যদি ভেঙে যায় তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হবে এবং বিমানটি ভূপাতিত হবে।

‘Understanding Flight’ বইয়ের সহ গ্রন্থকার, University of Washington’এর Astronautics and Aeronautics বিভাগের ডঃ ডি স্কট এবারহার্ড বলেন, “একটি 747 উড়ার সময় এর উইং প্রতি সেকেণ্ডে প্রায় ৯ লক্ষ পাউন্ড বাতাস স্থানান্তর করে।

About Ashiqur Rahman

Ashiqur Rahman

একটি উত্তর দিন