বিদায় দোয়েল – স্বাগতম ট্যাবলেট পিসি !

বিদায় দোয়েল – স্বাগতম ট্যাবলেট পিসি !

বাজারে আসার আগেই বন্ধ হয়ে গেছে ‘দেশি’ ল্যাপটপ দোয়েল। আলোচিত উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দোয়েল ল্যাপটপ উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কারিগরি ও আর্থিক সমস্যাই এর কারণ। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও ‘ভিশন ২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ২০০৯ সালের জুনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ল্যাপটপ উৎপাদনের ঘোষণা দেয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি দেশি ও একটি বিদেশি কোম্পানিকে নিয়ে টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) ল্যাপটপ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। তবে সরকার মাত্র ১০ হাজার টাকায় দেশে উৎপাদিত ল্যাপটপের স্বপ্ন দেখালেও এর প্রতিটি অংশ চীনে তৈরি। চীনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান শেয়ার ট্রনিক করপোরেশনের মাধ্যমে সব যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়। টেশিসের গাজীপুর কারখানায় তা শুধু সংযোজন করা হয়। যদিও দোয়েলের উদ্বোধনের দিন টেশিসের তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইসমাইল বলেন, এর ৬০ শতাংশ যন্ত্রপাতিই দেশে উৎপাদন করা হবে; বাকি ৪০ শতাংশ চীন, কোরিয়া ও তাইওয়ান থেকে আমদানি করা হবে। প্রধান কারণ আর্থিক সমস্যা: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেশিসের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দোয়েল ল্যাপটপ বন্ধের প্রধান কারণ অর্থ। তাঁরা জানান, ল্যাপটপ তৈরিতে প্রাথমিকভাবে ১৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের টাকা বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান থিম ফিল্ম ট্রান্সমিশনের (টিএফটি) তরফ থেকে আসার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত শুধু বাংলাদেশ সরকার টাকা দিয়েছে। ফলে ল্যাপটপ তৈরির কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

টেশিস সূত্র জানান, আপাতত ঘূর্ণমান চলতি মূলধন (রিভলভিং ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) হিসেবে ৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ টাকা ধার নেওয়ার চিন্তা করছে কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে আগামী বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। দোয়েলের চার মডেল: গত ১১ অক্টোবর জাতীয় পাখি দোয়েলের নামে প্রধানমন্ত্রী জাঁকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠানে এ ল্যাপটপের উদ্বোধন করেন। ঐতিহাসিক চার ঘটনা—ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মরণে ‘দোয়েল প্রাইমারি মডেল-২১০২’, বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ স্মরণে ‘দোয়েল বেসিক মডেল-০৭০৩’, স্বাধীনতা দিবস স্মরণে ‘দোয়েল স্ট্যান্ডার্ড মডেল-২৬০৩’ এবং বিজয় দিবস স্মরণে ‘অ্যাডভান্স মডেল-১৬১২’ তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে দোয়েল প্রাইমারি নেট বুকের দাম ১০ হাজার টাকা, বেসিক নেট বুকের দাম ১৩ হাজার ৫০০ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড নেট বুকের দাম ১৬ থেকে ২২ হাজার এবং অ্যাডভান্স নেট বুকের দাম ২২ থেকে ২৮ হাজার টাকা। বৈশিষ্ট্য ভেদে দামের এ পার্থক্য। কারিগরি সমস্যা ও অভিযোগ: খুব অল্পসংখ্যক দোয়েল ল্যাপটপ সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছানো হয়েছে। তাঁদের অনেকের অভিযোগ, খুবই পাতলা প্লাস্টিক ধরনের আবরণ দিয়ে ল্যাপটপ তৈরি করা হয়েছে। ব্যাটারির ক্ষমতা কম। অপারেটিং সিস্টেমে ঠিকমতো কাজ করা যায় না। এ ছাড়া লিকুইড ক্রিস্টাল ডিসপ্লে (এলসিডি) মনিটর ঘোলা।

টেশিসের হিসাবে ‘দোয়েল প্রাইমারি মডেল-২১০২ মাত্র ৮-১০টি উপহার হিসেবে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে দেওয়া হয়েছে। চার হাজার ৭০০ জন দোয়েল বেসিক নেট বুক ব্যবহার করেন। আর দোয়েল স্ট্যান্ডার্ড নেট বুক এবং দোয়েল অ্যাডভান্স নেট বুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা হাজার খানেক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেশিসের একাধিক প্রকৌশলী জানান, ব্যাটারি ও মনিটর নিয়ে ব্যবহারকারীদের অভিযোগ সঠিক। এ সমস্যাগুলোর সমাধানে ইতিমধ্যে যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ওই প্রকৌশলীরা জানান, দেশের বেশির ভাগ ব্যবহারকারী উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে অভ্যস্ত হওয়ায় তাঁরা দোয়েল মডেলগুলোতে ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। প্রাইমারি নেট বুকে অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। বাকি তিনটি নেট বুক চলে লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: টেশিসের মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যান) আ আ মো. মোয়াসির দোয়েলকে সফল প্রকল্প হিসেবে দাবি করেন। উৎপাদন বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নয় সদস্যের একটি জাতীয় কমিটি রয়েছে। তাঁদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপাতত উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ রাখা হয়েছে।

ব্যবহারকারীর অভিযোগ প্রসঙ্গে মোয়াসির বলেন, ‘পণ্যের গুণগত মান উন্নত করে বাজারে নিয়ে আসার জন্যই কাজ চলছে। তবে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।’ এদিকে দোয়েল নিয়ে হোঁচট খেলেও এখন ট্যাবলেট পিসি বা ‘আরও উন্নত কিছুর’ চিন্তা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. মোস্তফা আকবর বলেন, ‘১০ হাজার ও ১৩ হাজার টাকার ল্যাপটপগুলোর তৈরি ও ক্রম উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত যন্ত্রপাতি পাওয়া একটু কঠিন। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কমিটি ট্যাবলেট পিসি বা আরও উন্নত কিছু তৈরি করার সুপারিশ করেছে।

গত মঙ্গলবার সংসদে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদও বলেছেন, সরকার দ্রুত বাজারে ট্যাবলেট পিসি নিয়ে আসবে।

About blogger - ব্লগার

একটি উত্তর দিন