ফ্রিল্যান্সিংয়ে তরুণ প্রতিনিধি

ফ্রিল্যান্সিংয়ে তরুণ প্রতিনিধি

ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। আউটসোর্সিং কাজের ক্ষেত্রে বিশ্বসেরা তিনটি মার্কেটপ্লেস হচ্ছে ওডেস্ক, ফ্রিল্যান্সার এবং ইল্যান্স। বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের সুযোগ-সুবিধা দেখতে তিনটি প্রতিষ্ঠানই নিয়োগ করেছে বাংলাদেশ প্রতিনিধি। তরুণ এই তিন প্রতিনিধিকে নিয়ে এই লেখা…

সাঈদুর মামুন খান
বাংলাদেশ প্রধান, ই-ল্যান্স
Saidur Mamun  Khanআগাগোড়া বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র সাইদুর মামুন খান। তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক বিশেষায়িত কোনো কাজ করেন না তিনি। এরপরও একজন সফল ফ্রিল্যান্সার মামুন। এখন তিনি অন্যতম জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস ইল্যান্সের বাংলাদেশ ব্যবস্থাপক। শুনে একটু খটকা লাগে! উত্তরা হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক [২০০২] এবং সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমকি [২০০৪ সাল] পাস করা মামুন জানান, ফ্রিল্যান্সিং শুরুর আগে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করেন তিনি। পড়াশোনার ফাঁকে চাকরি করেছেন দেশের জনপ্রিয় একটি সেলফোন অপারেটর কোম্পানিতে। ফ্রিল্যান্সার হওয়ার গল্প শোনাতে গিয়ে তিনি জানান, বছর পাঁচেক আগেও বাংলাদেশ থেকে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ করতেন হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনার কারণে ব্যবস্থাপনার কাজটি জানা ছিল। ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে ঢুকে দেখি অনেকে কাজ পারে কিন্তু ক্লায়েন্টের সঙ্গে যথোপযুক্তভাবে কাজের চুক্তি করতে পারে না। ক্লায়েন্ট এবং ফ্রিল্যান্সারের মাঝে আমি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে আমার ফ্রিল্যান্স জীবন শুরু। কাজটি বেশ মজার। যোগাযোগ দক্ষতা, ক্লায়েন্টের চাহিদা এবং ফ্রিল্যান্সর সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকলে রিক্রুয়েন্টের কাজটা সফলভাবেই করা সম্ভব। এক সময় ক্লায়েন্টের পুরো প্রজেক্টের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। আর এ ব্যবস্থাপনা দক্ষতাই তাকে চূড়ান্ত সফলতা এনে দেয়। ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময় ইল্যান্স বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন তিনি। নিজে ফ্রিল্যান্সিং না করলেও ছোট বোন এবং স্ত্রী ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নিজেদের অবস্থান করে নিতে পেরেছে। ইল্যান্সে তিনি নিয়োগ পাওয়ার পর মার্কেটপ্লেসটিতে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারও বেড়েছে। ২০১১ সালে ইল্যান্সে মোট ৪ হাজার ৯১৮টি কাজে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার নিয়োগ পেয়েছিলেন। যেখানে ২০১২ সালে ১০ হাজার ৯৮২টি কাজে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা নিয়োগ পেয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৩ হাজার ফ্রিল্যান্সার আছেন যারা ইল্যান্সে নিবন্ধিত। ইল্যান্স বাংলাদেশে বেশ কিছু কার্যক্রম করার ব্যাপারে আগ্রহী। ইতিমধ্যে শুরু করেছি বিভিন্ন সেমিনার, ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ, অনলাইন সেমিনার ইত্যাদি দিয়ে, যাতে আগ্রহীরা আমাদের পথনির্দেশনা পেয়ে এই পেশায় আসতে উৎসাহ এবং ভরসা পান এবং যাতে কাজ শুরু করে দিয়েছেন এমন ফ্রিল্যান্সাররা আমাদের সাজেশন পেয়ে নিজেদের আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারেন।

মাহমুদ হাসান সানি
কান্ট্রি অ্যাম্বাসাডর, ওডেস্ক
Mahmud Hasan Sunnyশৈশবেই সানির খেলার সঙ্গী প্রোগ্রামিং। পুরো নাম মাহমুদ হাসান সানি। প্রকৌশলী বাবা এবং গৃহিণী মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। তিন বোন সবাই তার বড়। বোন একজন স্থপতি, একজন ডাক্তার, একজন প্রকৌশলী। সানি বড় হয়ে কী হবে_ উত্তর খোঁজার চেয়ে বন্ধুরা যখন খেলার মাঠে সানি তখন প্রোগ্রামিংয়ের বই হাতে কম্পিউটার টেবিলে থাকেন। কোনো প্রশিক্ষণ নেই, নেই কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা। এরপরও প্রোগ্রামিংই তার বন্ধু। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই জার্মান ভিত্তিক একটি অপারেটিং সিস্টেমের বাংলা সংস্করণ করে ফেলেন তিনি। ‘বাংলা দুয়ার’ নামের এ অপারেটিং সিস্টেম রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের প্রথম বিজ্ঞান মেলায় সেরা প্রকল্প হিসেবে পুরস্কার জেতে। এ প্রতিষ্ঠান থেকেই বিজ্ঞান বিভাগে ২০০৬ সালে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক [২০০৮] পাস করেন তিনি। পাঠ্যবইয়ের চাপেও প্রোগ্রামিংয়ের শখ মাথা থেকে নামেনি। নিজে নিজেই সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট করতে পারেন। সশিক্ষিত এই প্রোগ্রামারের উচ্চমাধ্যমিক পাশের আগেই একটি সফটওয়্যার ফার্মে চাকরিও জুটে যায়। এরই মধ্যে দেশে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ অল্প পরিসরে শুরু হয়। ইন্টারনেটে কাজ করে টাকা আয়ের এ পদ্ধতিটি টানে তাকে। শুরু করেন কাজ। রেন্ট অ্যা কোডার, ফ্রিল্যান্সার হয়ে ২০১০ সালে ওডেস্কে প্রোফাইল খোলেন। প্রথমেই ৫৫০ ডলারের কাজ পেয়ে যান তিনি। প্রতিমাসে আয়ের পরিমাণ বাড়তে থাকে। সানি জানান, ওডেস্কের অ্যাপ্রিসিয়েশন ডেতে টেবিল লিডারের ভূমিকা পালন করি। সেখান থেকে ওডেস্কের নজরে আসি। গত বছরের ডিসেম্বরে ওডেস্কে বাংলাদেশ অ্যাম্বাসাডর হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। ওডেস্ক থেকে গত বছর ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় করেছে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা। ওডেস্ক চায় তাদের ব্যবহারকারীরা এগিয়ে যাক। সানি জানান, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তার নেতৃত্বে এটিএম মেশিন আদলে ভেন্ডিং মেশিনের জন্য সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে। ডিভাইসটি যুক্তরাষ্ট্রের ছয় হাজার চার্চে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবহারকারীরা ধর্মীয় প্রকাশনা কিংবা সিডি/ডিভিডি কিনে এই মেশিনের মাধ্যমে এটিএম কার্ড কিংবা নগদ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে দাম শোধ করে। ডিভাইসটিতে লেখা থাকছে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’। এটি আমাদের জন্য দারুণ উৎসাহের। কাজটি করতে পেরে একজন বাংলাদেশি হিসেবে গর্ববোধ করি।

নাবিলা খোরশেদ
বাংলাদেশ প্রধান, ফ্রিল্যান্সার ডটকম
Nabila Khurshedমূলত মার্কেটিং ও ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করে আসছি। বিবিএ শেষ করার পর একটি আন্তর্জাতিক রিসার্চ এজেন্সিতে যোগ দিই। তবে গত বছরের শেষ দিকে লিংকডইনে ফ্রিল্যান্সার ডট কমের এশিয়ার পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। এরপর আরও কয়েক পরিচালকের সঙ্গে স্কাইপে আলাপ হয়। ব্যস, কিছু দিন পর থেকে যুক্ত হয়ে গেলাম।
বাংলাদেশে আউটসোর্সিংয়ে বর্তমান অবস্থা এখন বেশ ভালো। শুধু ফ্রিল্যান্সার ডটকমেই আছে ২ লাখের বেশি বাংলাদেশি ব্যবহারকারী এবং ইতিমধ্যেই আমরা ৫ নম্বর র‌্যাংকিংয়ে আছি। প্রতিদিনই ১১ থেকে ১৩ হাজার ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন মার্কেটপ্লেসটিতে। এই সাইটে একটি জনপ্রিয় কাজের ধরন হচ্ছে ‘কনটেস্ট’, যা বাংলাদেশিরা কয়েকবার জিতেছেন। ফ্রিল্যান্সিংকে জনপ্রিয় করতে আমি কিছু কাজ করতে চাই। আমি মনে করি, যে কোনো কাজ বা আইডিয়াকে জনপ্রিয় করতে লাগে রোল মডেল। সবার আগে দরকার দেশজুড়ে সফল ফ্রিল্যান্সারদের গল্প ছড়িয়ে দেওয়া। ফ্রিল্যান্সার ডটকম ফ্রিল্যান্সিংকে আরও জনপ্রিয় করে দেশের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের ফলে দেশে যে বৈদেশিক মুদ্রা আসতে পারে তা এক সময় বর্তমান রেমিট্যান্সকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিনিয়ত গ্রুপ, মেইল, ফেসবুক পেজ, ইভেন্টের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের বিভিন্ন সহায়তা করে আসছি। জেলাভিত্তিক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শিগগিরই এটি করা হবে। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফ্রিল্যান্সাররা অনেক গাইডলাইন পাবেন। আমি নিজে ফ্রিল্যান্সিং করি না। তবে মার্কেট রিসার্চ আর ব্র্যান্ড বিষয়ক প্রজেক্ট করি অফলাইনে। দেশের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের চেষ্টা থাকবে প্রতিনিয়ত মানুষকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহী করে তোলা। নতুনরা ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল হতে চাইলে ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই। নিজেকে সব অবস্থায় হালনাগাদ রাখতে হবে। আপনার ফেসবুক, লিংকড ইন, গুগল যা যা প্রোফাইল আচ্ছে প্রত্যেকটা গুছিয়ে রাখতে হবে ও খেয়াল রাখতে হবে যেন আপনার প্রোফাইল আপনার ব্যাপারে নেতিবাচক কোনো ইঙ্গিত না দেয়। আপনার বেশ কিছু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে। সামনে আরও উন্নয়নমূলক কাজে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা আছে। আমি অনেক আগে থেকেই নতুন নতুন কাজে যোগ দিয়ে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও গঠনমূলক পরীক্ষা করার সুযোগ ছাড়ব না। পাশাপাশি মার্কেটিং ক্যারিয়ারও চালিয়ে যাব।

লেখাটি আজকের সমকালে প্রকাশিত

About বদরুদ্দোজা মাহমুদ তুহিন

একটি উত্তর দিন