নগদ লভ্যাংশের খেলায় গ্রামীণফোন

নগদ লভ্যাংশের খেলায় গ্রামীণফোন

নির্দিষ্ট সময় শেষে যে পরিমান লাভ হচ্ছে তা তো নিচ্ছেই; বরং তার চেয়েও অনেক বেশী লভ্যাংশ ঘোষণা করে নগদ টাকা তুলে নিচ্ছে গ্রামীণফোনের মূল বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে নগদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে কোম্পানিটি। সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণেই বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার কৌশল হিসেবেই বেশী বেশী লভ্যাংশ ঘোষণা করছে কোম্পানিটি।

এক বছরের মধ্যে নেট লাভের চেয়েও ৮৮৮ কোটি টাকা বেশী নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে।
নগদ লভ্যাংশ ঘোষণার এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গত দুই বছরের মধ্যেই গ্রামীণফোনের মূল কোম্পানি টেলিনর বুঝে নিছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানির কর্পোরেট শেয়ার হোল্ডাররাও এ বিষয়ে গ্রামীণফোনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। শেয়ার মার্কেট বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। তবে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ বলছে, সব নিয়ম কানুন মেনেই শেয়ার হোল্ডারদের লভ্যাংশ দিচ্ছেন তারা। বিভিন্ন সময়ের পুঞ্জীভূত মুনাফা থেকে বড় অংকের লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলেও দাবি করেছে গ্রামীণফোন।

শেষ হওয়া ২০১১ সালে দেশের গ্রাহক সেরা অপারেটরটির ২০৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এ সময় তারা নেট লাভ করেছে ১ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে তারা শেয়ার হোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এক বছরের মধ্যে নেট লাভের চেয়েও ৮৮৮ কোটি টাকা বেশী নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে।

গ্রামীনফোনের ৫৬ শতাংশের চেয়েও বেশী শেয়ার নরওয়ের টেলিনরের হাতে থাকায় হিসেব মতে তাদের হাতে নগদ লভ্যাংশের ১ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা তাদের পকেটে চলে গেছে। একই সঙ্গে এই টাকার পুরোটাই সমপরিমান ডলার ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বৈধ পথেই নরওয়েতে নিয়ে গেছেন তারা।

তাছাড়া গ্রামীণফোনের অন্যতম শেয়ার হোল্ডার গ্রামীন টেলিকম পেয়েছে ৯৪৪ কোটি টাকা। আর ১৩ কোটি ৫৩ লাখ শেয়ারের বিপরীতে মাত্র ২৭৭ কোটি টাকা পেয়েছে পুঁজিবাজারের নগণ্য বিনিয়োগকারীরা।

বছরের অর্ধেক সময় যাওয়ার পর যখন ১৪০ শতাংশ মধ্যবর্তী লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয় তখন প্রথম ছয় মাসে গ্রামীণফোনের ৬৭৭ কোটি টাকার নেট মুনাফা হলেও লভ্যাংশ বিতরণ করা হয় ১ হাজার ৮৯০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে টেলিনর পেয়ে গেছে ১ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। আর দেশীয় অপর বিনিয়োগকারী গ্রামীণ টেলিকম পেয়েছিল ৬৪৬ কোটি টাকা। গ্রামীণফোনের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৩৫ কোটি ৩ লাখ ২২টি।

মধ্যবর্তী লভ্যাংশ ঘোষণার পরেই একটি হোটেলে কর্পোরেট শেয়ার হোল্ডারদের সঙ্গে গ্রামীণফোনের বৈঠকে গ্রামীণফোনের কর্পোরেট শেয়ার হোল্ডার হিসেবে এ বি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাষ্ট ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মিউচুয়াল ট্রাষ্ট ব্যাংকের প্রতিনিধিরা লাভের চেয়ে তিন গুন বেশী হারে লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। এতে ভবিষ্যতে কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্থ হবে বলেও মন্তব্য করে ট্রাষ্ট ব্যাংক।

এর আগে ২০১০ সালে দুই দফায় ১২০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। সে সময়ও কোম্পানি নগদ ১ হাজার ৬২০ কোটি ৩৬ লাখ ২৬০ টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করে। গত বছর প্রথমে জুলাইয়ে এবং পরে বছর শেষে আরো একবার লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। দুই দফায় ১০ শতাংশ শেয়ারের জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পান ১৬২ কোটি ৩ লাখ টাকার লভ্যাংশ। টেলিনর নিয়েছিল ৯০৪ কোটি কয়েক লাখ টাকা। আর গ্রামীণ টেলিকম পায় ৫৫১ কোটি টাকা। টেলিনরের পুরো টাকাটাই ডলার হয়ে চলে যাচ্ছে নরওয়েতে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গ্রামীণফোনের ডেপুটি সিইও এবং চিফ ফাইন্যান্সসিয়াল অফিসার রায়হান শামসী বলেন, কোম্পানি অনেক ভালো করছে। সে কারণে বেশী লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে। এখানে আর কিছুই নেই। তাছাড়া বেশী বেশী নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা শেয়ার হোল্ডারদের দাবি বলেও জানান তিনি।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কোম্পানি স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও ঋণ নিয়ে লভ্যাংশ দিচ্ছে না। তাছাড়া ঋণ একটি কোম্পানির অংশ। তিনি আরো বলেন, শুধু ঋণ নেওয়া নয় বরং আরো নগদ বিনিয়োগের পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন তারা।

তবে গ্রামীণফোনের অপর একটি সূত্র বলছে, মূলত পুঞ্জিভূত মুনাফ থেকেই বাড়তি লভ্যাংশ ঘোষণা করা হচ্ছে। তারা বলেন, বোর্ড যদি মনে করে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ মুনাফা দেবে; দিতে পারে। পুঞ্জীভূত মুনাফা বিনিয়োগকারীদেরই টাকা। সুতরাং এই টাকা থেকে কিছুটা গ্রাহকরা পেলে ক্ষতির কিছুই নেই।

তবে বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, আইন বহির্ভূত না হলেও লাভের চেয়ে কয়েকগুন বেশী লভ্যাংশ ঘোষণা করলে ভবিষ্যতে কোম্পানি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, কি কারণে গ্রামীণফোনে এতো বেশী লভ্যাংশ দিল তার ব্যাখ্যা তারা দেবে। কিন্তু ভবিষ্যতে কোম্পানিকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারত তারা।

এর আগেও বিভিন্ন বছরের লাভ লোকসানের হিসেব শেষে নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কোম্পানিটি। কিন্তু তখন লভ্যাংশের পরিমান এতো বেশী ছিল না। এর মধ্যে সরকার বৈদেশিক লেনদেনে খানিকটা উদারতা দেখায়। আর তার পর গত বছর থেকেই হঠাৎ করে তাদের উচ্চ হারে লভ্যাংশ ঘোষণার হার বেড়েছে।

গ্রামীণফোনের গত বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৬ সালেও কোম্পানিটি ৬০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। পরের বছর এটি ছিল ৬২ শতাংশ। ২০০৮ সালে এটি মাত্র ১৩ শতাংশ এবং পুঁজিবাজারে আসার আগ পর্যন্ত ২০০৯ সালে তা ছিল ৬০ শতাংশ।

About blogger - ব্লগার

একটি উত্তর দিন