দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাব্রেইল প্রজেক্ট

দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাব্রেইল প্রজেক্ট

দৃষ্টিহীন শিশুদের কাছে পাঠ্যবই পৌছে দেয়ার লক্ষ্যে জুন মাসের শেষে শুরু হয় বাংলাব্রেইল প্রজেক্ট (http://www.banglabraille.org) । কারিগরী জটিলতা ও ব্রেইল বই ছাপার উচ্চমূল্যের কারণে বছরের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুরা বই হাতে পায়নি। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে এক ঝাঁক উদ্যমী মানুষ তাই তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে এসে গঠন করেছেন এই বাংলাব্রেইল প্রজেক্ট।

ফেইসবুকের মাধ্যমে আগ্রহী স্বেচ্ছাসেবীরা সংগঠিত হয়ে গত ১ মাস ধরে বাংলাদেশের স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যবইগুলোকে টাইপ করে ব্রেইলে ছাপার জন্য উপযোগী ইউনিকোড সংস্করণে রূপান্তর করেছেন, আর এর পাশাপাশি কাজ চলছে পাঠ্যবইগুলোর অডিও সংস্করণ — যেখানে বাংলাব্রেইলের স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা সম্পূর্ণ পাঠ্যবই পড়ে অডিও রেকর্ড তৈরী করে দিচ্ছেন। দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরা এসব অডিওবই মোবাইল ফোন বা অন্যান্য মাধ্যমে বাজিয়ে শুনতে পারবে।

Bangla Braille

জুলাই মাসের ২৮ তারিখের হিসাবে বাংলাব্রেইলের ফেইসবুক গ্রুপে যোগ দিয়েছেন প্রায় ২৬০০ জন কর্মী। পুরো কাজটি সমন্বয় করছেন বাংলাব্রেইলের প্রতিষ্ঠাতা কম্পিউটার বিজ্ঞানী ডঃ রাগিব হাসান। তার সাথে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসাবে রয়েছেন প্রবাসী সফটওয়ার প্রকৌশলী ইশতিয়াক রউফ, ডঃ সালওয়া মোস্তাফা, এবং আরো অনেকে।

অডিওবুক সাবপ্রজেক্টের দায়িত্বে থাকা ডঃ সালওয়া মোস্তাফা জানালেন, এ পর্যন্ত বাংলাব্রেইলের কর্মীরা ১৭টি অডিওবুক এবং ২২টি ইউনিকোডকৃত টেক্সটবুক তৈরি করে দিয়েছেন। অডিওবুক প্রজেক্টের অধীনে এ মূহুর্তে প্রায় ৫৭ জন স্বেচ্ছাসেবক বই তৈরীর কাজ করেছেন। এই কাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিয়েছেন অভিনেত্রী লুতফুন্নাহার লতা এবং বিটিভির মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক রেজাউল করিম সিদ্দিক। এ অবধি প্রায় ৯০ ঘন্টার অডিও রেকর্ড করা হয়েছে। সম্পূর্ণ রেকর্ড হওয়া অডিওবইগুলো এই মূহুর্তে ডাউনলোড করা যাবে বাংলাব্রেইলের ওয়েবসাইট থেকে। পরবর্তীতে অডিওবইগুলো এমপিথ্রি প্লেয়ারে করে বাংলাদেশের নানা জায়গার দৃষ্টিহীন শিশুদের মাঝে বিতরণ করার পরিকল্পনা আছে। এছাড়া এই অডিওবুকগুলো যেকোন শিক্ষার্থীই সহায়ক পাঠ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

বাংলাব্রেইলের প্রজেক্ট ম্যানেজার ইশতিয়াক রউফ জানিয়েছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা মিলেমিশে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বেশ উৎসাহব্যঞ্জক গতিতে। কোনো প্রকার বাধা বা প্রশ্নের সম্মুখীন হলে সকলে মিলে সমাধান বের করছেন। এরই মধ্যে বেশ কিছু বই ইউনিকোডে রূপান্তরিত হয়েছে, চূড়ান্ত রিলিজের আগে সেগুলোর প্রুফরিডিং ও ফরম্যাটিং-এর কাজ চলছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের জন্য সুলভে ব্রেইল বই ছাপানোর প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি প্রাথমিক শ্রেণির বিভিন্ন ছবি কীভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পরিবেশন করা যায় তা নিয়েও বিভিন্ন রকম চিন্তা-ভাবনা চলছে। প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১০৭টি পাঠ্যবইয়ের মধ্যে কিছু বইয়ের অডিও সংস্করণ তৈরির কাজও বাকি আছে। উল্লেখকৃত কাজগুলোয় সাহায্য করতে আগ্রহী যেকোনো স্বেচ্ছাসেবক এখনও প্রজেক্টে যোগ দিতে পারেন। প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা ওয়েবসাইটের প্রথম পাতাতেই দেওয়া আছে।

আগামী পরিকল্পনা কী, এই প্রশ্নের জবাবে বাংলাব্রেইলের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ রাগিব হাসান বললেন তাঁর স্বপ্নের কথা — পরবর্তি পর্যায়ে স্কুলের পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বইয়ের ব্রেইল ও অডিও সংস্করণ তৈরী করার পরিকল্পনা আছে। এছাড়া বাংলাব্রেইলের ভলান্টিয়ারেরা ইতিমধ্যেই বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সব সাহিত্যকর্মকে অডিও ও ব্রেইল সংস্করণে রূপান্তরের কাজ শুরু করেছেন। আর সুলভে বইগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে পৌছে দেয়ার জন্য মোবাইল ফোন অ্যাপ, এবং অন্যান্য বহনযোগ্য ব্রেইল রিডার তৈরীর উপরেও গবেষণা চলছে।

সবশেষে ডঃ রাগিব হাসান জানালেন একটি অভিজ্ঞতার কথা  – “এই প্রজেক্ট শুরু করার কয়েকদিন পরে দুইজন বাবার কাছ থেকে ইমেইল পেলাম। তাদের সন্তানদের দৃষ্টিশক্তি নেই, একজন জন্মান্ধ, আরেকজনের দৃষ্টি আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে গেছে। এই শিশুরা অন্য সব শিশুর মতোই জানতে, শিখতে, পড়তে খুবই আগ্রহী। কিন্তু ব্রেইল বইয়ের অভাবে তারা পাঠ্যবই হাতে পাচ্ছেনা, আর একজনের এলাকায় দৃষ্টিহীনদের উপযোগী স্কুল নাই বলে তার পড়ালেখা থেমে গেছে। স্নেহশীল বাবারা তাই প্রশ্ন করেছেন, তাঁদের এই দৃষ্টিহীন শিশুদের জন্য কী করতে পারি?”

ডঃ রাগিব হাসান এর মতে,

এমন বাবাদের প্রশ্নের জবাব দিতেই আসলে এগিয়ে এসেছি, সাথে আছে হাজারো তরুণ-তরুণী, দৃষ্টিহীন শিশুদের জন্য ভালোবাসা নিয়ে তারা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে কাজ করে চলেছে বাংলাব্রেইল প্রজেক্টে।

 

Project Link: http://www.banglabraille.org

Facebook Group: http://www.facebook.com/groups/banglabraille

About বদরুদ্দোজা মাহমুদ তুহিন

একটি উত্তর দিন