দিন বদলের স্বপ্ন দেখছে খুদে অ্যাপ নির্মাতারা

দিন বদলের স্বপ্ন দেখছে খুদে অ্যাপ নির্মাতারা

‘অ্যাপ্লিকেশনই আমরা ধ্যান-জ্ঞান। এমন অ্যাপ্লিকেশন করতে চাই যা থাকবে দেশের কোটি মানুষের হাতে হাতে। মানুষের মৌলিক নানা প্রয়োজন মেটাবে’- এভাবেই নিজের পরিকল্পনার কথা জানালেন উদীয়মান অ্যাপ ডেভেলপার নুর হোসেন ভুইয়া। ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউটের এই শিক্ষার্থীর তৈরি অ্যাপ্লিকেশন ‘বিডি হসপিটাল ইনফো’ এখন পাওয়া যাচ্ছে গুগল প্লে স্টোরে।

নুর হোসেনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়নে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি কর্মসূচি। বিডি হসপিটাল ইনফোকে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ উল্লেখ করে এই তরুণ ডেভেলপার জানান, আমার জেলা ফেনিতে অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টের প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে এই অ্যাপটি বানাই। টানা চল্লিশ ঘন্টার এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচীর শেষ দিনে এসে প্রাপ্ত জ্ঞান থেকে একটি অ্যাপ বানাতে হয়। ফেনিতে বসে বানানো আমার এই অ্যাপটিই সেখানে প্রথম স্থান অর্জন করে। ভবিষ্যতে জাতীয়-আšত্মর্জাতিক পর্যায়ে নিজের অ্যাপ দিয়ে সেরার মুকুট অক্ষুন্ন রাখতে বিস্তর প্রস্তুতি নিচ্ছেন নুর হোসেন।

মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন শিল্পের বিশাল আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেকে অ্যাপ ডেভেলপার হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে নুর হোসেনের মতো অসংখ্য তরুণ। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তুলে ধরতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আখলাসুর রহমান ভুইয়া বানিয়েছেন ‘মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প’, ধানমন্ডি টিউটোরিয়াল স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ইসফার হাসান বানিয়েছেন ‘তাসবি’, ইউল্যাবের তানভির ইসলাম বানিয়েছেন ‘অল বাংলা নিউজপেপার’ অ্যাপ।

opening program training at dhaka

থ্রিজির আবির্ভাবে দেশে কনটেন্টের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে উচ্চগতির ইন্টারনেট কাজে আসবে না যদি স্থানীয় কনটেন্ট মার্কেট তৈরি না হয়। তাই মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের ক্রমবর্ধমান বাজারে দেশের তরুণ ডেভেলপারদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় কনটেন্ট মার্কেট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্মার্টফোন, ট্যাবলেটে ব্যবহার উপযোগী দেশীয় বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন তৈরির মহাযজ্ঞ চলছে। আর এই উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে দেশের অসংখ্য তরুণ নির্মাতা আগামী দিনের অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

ডাক, টেলিযোগাযোগও তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী চলছে জাতীয় পর্যায়ে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়নে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি কর্মসূচি। এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে এমসিসি লিমিটেড এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে ইএটিএল লিমিটেড। দেশের মোবাইল অ্যাপস নির্মাতা তৈরি করা এবং তাঁদের তৈরি অ্যাপ্লিকেশনের বাজার সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নেওয়া কার্যক্রমের ইতিমধ্যে নয় মাস পূর্ণ হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়নে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় সনদপত্রপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ইতিমধ্যে ২ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে সফল প্রশিক্ষণার্থীকে সনদপত্র দেওয়া হচ্ছে, যা তারা ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবেন। ইতিমধ্যে ৬৩টি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শেষ হয়েছে এবং এই প্রশিক্ষণগুলোতে ৫৪টি জেলার ২৪৪০ জনকে ছাত্রছাত্রীকে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

৭টি বিভাগীয় পর্যায়ে অ্যাপস সেনসেটাইজেশন-দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শিবিরে তৃণমূল পর্যায়ে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন শিল্প নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সারাদেশে কমপক্ষে ১০০০ জন সফটওয়্যার ডেভেলপারদের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এ পর্যন্ত ছয়টি বুট ক্যাম্পে মোট ৩০০৭ জন প্রশিক্ষণার্থী  অংশগ্রহণ করেছেন।

মোবাইলফোনের মাধ্যমে অ্যাপ্লিকেশনের ব্যবহার ঘিরে তথ্য প্রযুক্তির একটি নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হওয়ায় নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন তৈরি হচ্ছে তেমনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গেইম, সংবাদ, সোশাল মিডিয়া বা বিনোদনের জন্য নানা ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে শুধুমাত্র মোবাইলকে ঘিরেই। নোকিয়া স্টোর, গুগল প্লে, উইন্ডোজ মার্কেট প্লেস, ব্ল্যাকবেরি ওয়ার্ল্ড, স্যামসাং স্টোর, আইফোনের অ্যাপস স্টোর ইত্যাদি বাজারগুলোর মাধ্যমে মোবাইল সফট্ওয়্যার ডাউনলোড করছে এদেশের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা। এসব স্টোরে বাংলা ভাষার অ্যাপ্লিকেশনর সংখ্যা খুবই নগণ্য।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের বাজারে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং এ শিল্পের সাথে জড়িত সকলের আগ্রহ বাড়িয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশনের বাজারে আমাদের তরুণরা যাতে নেতৃত্ব দিতে পারে তার জন্য আমরা ব্যাপক কর্মসূচী হাতে নিয়েছি।’

স্থানীয় চাহিদার অ্যাপ্লিকেশন তৈরির প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উপসচিব ও কর্মসূচী পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, ‘সারা বিশ্বের বিভিন্ন মোবাইল সফট্ওয়্যার কোম্পানি, সফট্ওয়্যার প্রকৌশলী বা ব্যক্তিগতভাবে বানানো অ্যাপ্লিকেশন থেকে ডাউনলোডের সংখ্যা বছর শেষে প্রায় ৮১.৪ বিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। আগামী ২০১৬ সালে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের সরাসরি ডাউনলোড থেকে আয় হবে ২১.৭ বিলিয়ন ডলার। এ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বাজারের সাথে তৃণমূল পর্যায়ের মোবাইল সফট্ওয়্যার নির্মাতাদের যোগসূত্র স্থাপন করাই আমাদের এই কর্মসূচীর উদ্দেশ্য।’

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এমসিসি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী এস এম আশ্রাফ আবির জানালেন, ‘এমসিসি দেশে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবার উদ্ভাবনী প্রকল্প সাফল্যের সাথে বাস্তবায়ন করেছে। এমসিসির তৈরি বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ আšত্মর্জাতিক বাজার নোকিয়া স্টোর, গুগল প্লে, উইন্ডোজ মার্কেট প্লেস, ব্ল্যাকবেরি ওয়ার্ল্ড ও আইফোনের অ্যাপ স্টোরে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। এমসিসি তার মোবাইল অ্যাপ কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকারের এই কার্যক্রম পরিচালনা এবং পরিচালনা সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে।’

তিনি আরো বলেন, আমাদের এই কর্মসূচীর আওতায় একজন তরুণ নিজেকে ধাপে ধাপে একজন ডেভেলপার হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন।  জেলা পর্যায়ে টানা চল্লিশ ঘন্টাব্যাপী প্রশিক্ষণ কোর্স শেষ করার পর পরবর্তীতে একজন প্রশিক্ষণার্থী বিভাগীয় পর্যায়ে বুট ক্যাম্পে অংশ নিয়ে এক্সপার্টদের কাছ থেকে সমস্যার সমাধান নেওয়ার পাশাপাশি নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারবেন। এরপর জাতীয় হ্যাকাথন, অ্যাপ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকছে। এভাবে প্রায় বছরব্যাপী নানা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একজন তরুণ ডেভেলপার নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছেন।

training at dhaka-1

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আগামী আগস্ট মাস থেকে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের জাতীয় প্রতিযোগিতা শুরু হবে এবং নভেম্বর মাসে এই প্রতিযোগিতার চূড়াšত্ম পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রতিযোগিতা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। এছাড়া প্রশিক্ষণার্থীদের তৈরি করা অ্যাপসগুলো আগামী আগস্ট মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ শুরু হবে।

আইসিটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে আইডিয়া উদ্ভাবন কর্মশালার মাধ্যমে সারা দেশে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে কি ধরনের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের চাহিদা রয়েছে শুরুতেই সেটা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে বিভিন্ন উদ্ভাবনী এবং যুগোপযোগী চিন্তাগুলোও খুঁজে বের করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ১৩টি কর্মশালা সম্পন্ন হয়েছে যেখানে সরকারের ৪৫টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৫২০ জন কর্মকর্তা, প্রোগ্রামার, আইসিটি ফোকাল পয়েন্ট অংশগ্রহণ করেন। এই সকল কর্মকর্তারা দিনব্যাপী কর্মশালায় নিজস্ব ডোমেনের উপর মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নির্মাণের জন্য ১৯৪টি স্বতন্ত্র ধারণা প্রদান করেন।

কর্মসূচীর আওতায় যেসব আইডিয়া সংগ্রহ করা হয়েছিল সে আইডিয়া সংকলন থেকে অ্যাপ্লিকেশন প্রস্তুত করার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারী দপ্তরের বিভিন্ন সেবার মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং এ সকল অ্যাপস ওয়েবসাইটে প্রকাশসহ দেশীয় ও আšত্মর্জাতিক সকল মোবাইল স্টোরগুলোতে প্রকাশ করা হবে। এ অ্যাপসগুলোর ভেতরে ১০০টি সরকারী এবং জনসাধারণের আগ্রহ রয়েছে এমন সেবা নিয়ে মোবাইল অ্যাপস প্রস্তুত করা  হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে ২৬টি অ্যাপ্লিকেশন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং বাকি অ্যাপ্লিকেশনগুলোও নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। উল্লেখযোগ্য অ্যাপসের মধ্যে রয়েছে- পাবলিক লাইব্রেরি, ট্যাক্স ক্যালকুলেটর, প্রাইজ বন্ড, ই-জয়ীতা, এফডিসি, জাতীয় জাদুঘর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জাতীয় বাজেট, অফিসের ব্যায়াম, হাসপাতাল, ট্যুরিজম ইনফরমেশন, জন্মনিবন্ধন ভেরিফিকেশান, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিদ্যুৎ বিল, প্রাইজবন্ডের ফলাফল, আর্কিলজিক্যাল সাইট, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, হাসপাতালের তথ্য -ইত্যাদি।

পুরো প্রকল্পে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, এমসিসি লি. এবং  ইএটিএল এর সাথে অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে বেসিস, গ্রামীণফোন, রবি, নোকিয়া, সিম্ফনি, এসওএল কোয়েস্ট, গুগল ডেভলাপার গ্রুপ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ট্রেড এন্ড ইনভেস্টমেন্ট, কিউবি ও টেলিটক।

About অঞ্জন দেব

একটি উত্তর দিন