ঢাকায় আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলন অনুষ্ঠিত

ঢাকায় আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলন অনুষ্ঠিত

palokইমদাদুল হক: ইন্টারনেট দেশ এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে মানুষের সাথে মানুষের সংযোগ ঘটায়। প্রযুক্তির সহায়তায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মায়েরা বিদেশে অবস্থানরত প্রিয়জনদের সাথে ভাববিনিময় করতে পারছে। আমরা সকলেই প্রযুক্তির ভাল দিকের সাথেই অধিক পরিচিত। কিন্তু এর কিছু মন্দ দিকও রয়েছে; যেমন: ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু এবং ব্যাংক জালিয়াতির মতো ঘটনা ঘটছে। সাইবার ক্রাইমের কারণে জনসাধারণ বিভিন্ন ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে ৯ মার্চ রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে অনুষ্ঠিত হয় সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলন। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানান, প্রতি বছর দেশে ৪৪ শতাংশ ডাটার ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু ৭৫ শতাংশ অ্যাপস থেকে চুরি হচ্ছে প্রয়োজনীয় ও গোপনীয় তথ্য। এছাড়াও তথ্য জনিত অবকাঠামো নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে সরকারের ২২টি সংস্থা।
বাংলাদেশ সরকারের (আইসিটি বিভাগের এলআইসিটি প্রকল্পের) সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমের বর্ষপূর্তী উপলক্ষে আইসিটি বিভাগ আয়োজিত এ সম্মেলনে পলক বলেন, ‘যেসব অ্যাপসের সোর্স থাকে না সেগুলো অরক্ষিত। মোবাইলের নিরাপত্তা ভেঙে হ্যাকাররা অ্যাপসের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সব তথ্য চুরি করে। সোর্স না থাকা এসব অ্যাপসের সংখ্যা ৭৫ শতাংশ।
দেশে সাইবার সিকিউরিটির চ্যালেঞ্জ ও তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে এসময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের ২২টি সংস্থার অবকাঠামো নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। এগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের সরকারের লক্ষ্য দেশের প্রতিটি মানুষের ডিজিটাল স্বাক্ষর নিশ্চিত করা।’
ictdতিনি বলেন, দেশের সাইবার আকাশে পারিচালিত হামলার অধিকাংশই হয়ে থাকে দেশের বাইরে থেকে। তাই সাইবার হামলা দেশীয় কোনো সমস্যা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যাা। এটি মোকাবেলা করতে হলে সম্মিলিত ভাবেই করতে হবে। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের সাইবার আকাশ মুক্ত রাখতে আমরা সচেতনতা বাড়ানো থেকে শুরু করে কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লিথুনয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী রিমান্টাস জাইলিস ‘সাইবার ওয়ার্ল্ড ইজ গোয়িং ওয়াইল্ড: ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রেন্ডস’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন কর ন। আইসিটি বিভাগের সচিব সুবির কিশোর চৌধুরী, কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার সরকার প্রমুখ এসময় বক্তব্য রাখেন।
সম্মেলন বিশ্বখ্যাত সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ফায়ার আই, এনআরডি এএস, সিএ টেকনোলজিস, মাইক্রোসফট, সিসকো, রিভ সিস্টেম ও ওয়ান ওয়ার্ল্ড ইউএসএর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন। অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ২০ জনের মতো সাইবার নিরাপত্তা গবেষক এবং ২০০ শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা।
অনুষ্ঠানে ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার পরিচালক তারেক এম বরকতুল্লাহ বলেন, সাইবার জগতে নিজেদের নিরাপদ রাখতে হলে প্রযুক্তি খাতের কাঠামোগত সক্ষমতার দিকে নজর দিতে হবে। স্থাপন করতে হবে পর্যাপ্ত রক্ষাকবচ। একইসঙ্গে যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ পরিচালনার মাধ্যমে সংস্থাগুলোকে তাদের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের ই-সরকার ব্যবস্থা কে নিরাপদ রাখতে ইতিমধ্যেই ২ হাজার সরকারি কর্মকর্তাকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। এ জন্য লিভারেজ ইন আইসিটি প্রকল্পের অধীনে নরওয়ে ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এনআরডি এএস-কে নিয়োজিত করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (সার্ট)। সাইবার হামলা ও সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাড়াষি অভিযান চালাতে এই টিম সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী শেষে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ৬টি কর্ম অধিবেশন।
বাংলাদেশ সারকারের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা প্রবণতা বিষয়ক অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সার্ট বিশেষজ্ঞ দেবাশীস পাল এবং মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। অধিবেশনে সাইবার নিরাপত্তা এবং হাইব্রিড ক্লাউড ইকো সিস্টেমের ওপর একটি প্রামাণ্য তথ্য চিত্র উপস্থাপন করেন মাইকোসফট এর এশিয়া প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলের বিপনন ও পরিাচলন কর্মকর্তা রেনেটা চাই। বাংলাদেশের নাজুক সাইবার অবকাঠামো পরিস্থিতির চিত্র উপস্থাপন করেন ওয়ান ওয়ার্ল্ড ইউএসএ’র পরিচালক মারুফ আহমেদ। ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমে পজ মেশিনে ম্যালওয়্যার আক্রান্তের বিষয়ে সতর্কতা তুলে ধরেন ফায়ার আই এর নিরাপত্তা পরামর্শক মরিটজ র‌্যাবি, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি কমিয়ে আনার কিছু টনিক উপস্থাপন করেন সিসকো এর মানদ্বিপ সিং। এছাড়াও ডিজিটাল অবকাঠামোর স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন সিএ টেকনোলজি’র জয়দিপ বার্তাককে। আর সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষুদে বার্তা ও দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত ম্যাসেঞ্জার সেবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে ধরেন রিফ সিস্টেম এর প্রধান নির্বাহী আজমত ইকবাল।
ictসম্মেলন থেকে জানা যায়, বর্তমান সরকার সাইবার ক্রাইম ও নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে টেলিকম রেগুলেটরি অ্যাক্ট-২০১০ যুগোপযোগী করেছে। আইসিটি এ্যাক্ট-২০০৬ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ২০১৩ সালে আইসিটি অ্যাক্ট-২০০৬ এর সংশোধন হয়েছে। এতে সাইবার ক্রাইমের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেল এবং ১০ মিলিয়ন টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়াও বর্তমান সরকার সাইবার সিকিউরিটি স্ট্রাটেজি-২০১৪ প্রস্তুুত করেছে। সংসদ সদস্যরা সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ ও নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন। সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে আইসিটি বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রনয়ণকারী সংস্থার জনবলকে সক্ষম করে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

About Sohel Rana

একটি উত্তর দিন